-0.2 C
New York

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কারা? কী বলছে আইন

প্রশাসনিক আদেশ, আদালতের রায় কিংবা রাজনৈতিক আলোচনা—সবখানেই ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ শব্দবন্ধটি খুবই পরিচিত। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকলেই কি তাকে আইনের ভাষায় ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ বলা যাবে? 

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং এর সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলোতে এই পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এটি শব্দবন্ধটিকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোও দিয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের কর্মে বা সরকার-সংক্রান্ত কোনো কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।

কিন্তু আইন অনুযায়ী সবাই সরাসরি এর আওতাভুক্ত হবেন না।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও চাকরিজীবনের নিয়ন্ত্রণমূলক মূল আইন।

এই আইনের ২(১৬) ধারা অনুযায়ী, ‘সরকারি কর্মচারী’ বলতে এ আইনের আওতাভুক্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।

এখানে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগ’ বলতে রাষ্ট্রের অধীনে গঠিত কোনো কর্মবিভাগ, সার্ভিস, ক্যাডার বা সরকার অনুমোদিত কোনো স্বতন্ত্র ইউনিটকে বোঝায়। 

সংবিধানের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলি অনুচ্ছেদটি (১৩৩) প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং তাদের চাকরির শর্তাবলি নির্ধারণের মূল ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করে। 

আর কর্মবিভাগ-পুনর্গঠন অনুচ্ছেদটি (১৩৬) সরকারকে প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগ বা সার্ভিসগুলো ঢেলে সাজানোর ক্ষমতা দেয়। 

এই দুই অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে সরকার কোনো পদ সৃষ্টি করে কাউকে নিয়োগ দিলে তিনি এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হন।

প্রজাতন্ত্রের কর্মে সরাসরি নিয়োগের মূল ভিত্তি হলো মেধা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা।

সরকারের প্রশাসনিক, প্রতিরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।

অনেকেই সরকারি বা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করেন। কিন্তু এই আইনের ১(৩) ধারা অনুযায়ী সবাই সরাসরি এর আওতাভুক্ত হবেন না। 

ভিন্ন কোনো আইন বা চুক্তি না থাকলে নিচের ক্ষেত্রগুলো এই আইনের প্রয়োগ থেকে বাইরে থাকবে:
   

সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্যগণকে ‘সংসদ-সদস্য’ বলা হয়। আর স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাও (চেয়ারম্যান, সদস্য) প্রজাতন্ত্রের সরাসরি কর্মচারী নয়।

তাই জনপ্রতিনিধিরা সরকারি বেতনের আওতাভুক্ত হলেও তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন।   

স্ব-শাসিত সংস্থা বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এই আইনের আওতার বাইরে। 

তারপরও ২০২৩ সালের একটি সংশোধনীর মাধ্যমে (ধারা ১-এর ৪ক উপধারা) কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের ওপরও এই আইন প্রযোজ্য করা হয়েছে। যেমন: 

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক না হলে তাকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। 

এছাড়া, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে সরকার তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে পারবে ।   

সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। এই দায়িত্ব পালনে কোনো কর্মচারী যদি অসদাচরণ করেন বা দণ্ডপ্রাপ্ত হন, তবে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়:   

ফৌজদারি দণ্ড: কোনো কর্মচারী আদালতে মৃত্যুদণ্ড বা ১ বছরের অধিক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি রায়ের তারিখ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হবেন।

অসদাচরণ: ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করা বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কাজে অনুপস্থিত থাকাকে ‘সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর জন্য চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো দণ্ড হতে পারে।

অবসর ও পুনঃনিয়োগ

আইন অনুযায়ী, সাধারণ সরকারি কর্মচারীরা ৫৯ বছর বয়সে এবং মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীরা ৬০ বছর বয়সে অবসরে যান। তবে চাকরির সময় ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর জনস্বার্থে সরকার চাইলে কোনো কারণ না দেখিয়ে যে কাউকে অবসর দিতে পারে। 

আর অবসর গ্রহণের পর জনস্বার্থে কেবল রাষ্ট্রপতি কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারেন ।   

‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ হওয়া মানে আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে জনগণের সেবা করার একটি বিশেষ দায়িত্ব। 

আইনটি মূলত এই দায়িত্ব পালনকারীদের সুরক্ষা এবং জবাবদিহিতা—উভয়ই নিশ্চিত করে।

তথ্যসূত্র:

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮

স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯

Related Articles

Latest Articles