4 C
New York

শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা: অবকাঠামো বাড়লেও শিখনফল অর্জিত হয়নি

গত দুই দশকে স্কুলশিক্ষার অবকাঠামো ও পরিসংখ্যানিক সম্প্রসারণ দ্রুত হলেও শিখনফলে সমান অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তুত করা একটি খসড়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা রূপান্তরের লক্ষ্যে করা পর্যালোচনার প্রথম খণ্ড উন্মোচনের সময় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

এ পর্যালোচনার প্রথম খণ্ডে শিখন প্রক্রিয়ায় সংকট নির্ণয় এবং দীর্ঘমেয়াদী দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে নীতিমালা ও বাস্তবায়ন কাঠামো উপস্থাপন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় ইউনিভার্সিটি অব তাসমানিয়ার শিক্ষক অনন্ত নীলিম বলেন, ‘পর্যালোচনায় স্কুলশিক্ষার সম্প্রসারণ ও প্রকৃত শিখনফলের মধ্যে একটি স্থায়ী ব্যবধান চিহ্নিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ভর্তি হার, অবকাঠামো এবং সরকারি পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেও বহু শিক্ষার্থী এখনো সাবলীলভাবে পড়তে শেখেনি, প্রাথমিক গণিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি কিংবা ধারণা ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।’

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, স্বাধীন গবেষণা ও গৃহস্থালি জরিপগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল শিখনফলের চিত্র তুলে ধরেছে, বিশেষ করে গণিত ও অনুধাবনভিত্তিক কাজে। এসব ঘাটতি সংশোধনের বদলে শিক্ষা ব্যবস্থা এমন সূচককে অগ্রাধিকার দিয়েছে যেগুলো গণনা করা সহজ ও রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান—যেমন ভর্তি সংখ্যা, ভবন নির্মাণ ও পাসের হার—ফলে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিখনফলের গুরুত্ব কমে গেছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু নথিটিতে নয়, বরং যেভাবে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেই প্রক্রিয়াতেও নিহিত।’

তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি, পরিচয়, বঞ্চনা ও ব্যয়ের মতো কঠিন প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।’

পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের মূল সমস্যা নীতিগত ঘোষণার অভাব নয়, বরং বাস্তবায়ন ও ফলাফলের দুর্বলতা। এই প্রতিবেদন শিক্ষা তত্ত্ব নিয়ে নয়। এটি দেখেছে কেন ভালো তত্ত্ব ভালো ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন বলেন, ‘প্রতিবেদনটি বিদ্যমান পাঠ্যক্রম, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও শিক্ষা দর্শনকে প্রশ্ন করেছে এবং পরিবর্তনের জন্য পাঁচটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে।’

ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষা বিষয়ক আলোচনা অতিরিক্তভাবে পাঠ্যক্রম ও শিখন-শেখানো পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখানে মানবিক মূল্যবোধ উপেক্ষিত হচ্ছে।’

শিক্ষা খাতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবেদনটি একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্ণয় উপস্থাপন করেছে, তবে বাস্তবায়নই রয়ে গেছে প্রধান চ্যালেঞ্জ।’

তিনি একটি জানান এবং কাঠামোগত বিভাজন মোকাবিলায় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে মত দেন।

নীতিনির্ধারকদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গুরুত্বসহকারে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমান।

শিখনফলের এই সংকটকে স্বীকার করে নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলে আখ্যায়িত করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক যুগ্ম প্রকল্প পরিচালক চৌধুরী মুফাদ আহমেদ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত করা প্রয়োজন, তবে ভবিষ্যতে জাতীয় শিক্ষা উদ্দেশ্য কী হবে—সেই স্পষ্ট দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে এটি হতে হবে।

Related Articles

Latest Articles