সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের হয়রানি, নিজ নিজ কার্যালয়ে আটকে রাখা এবং কোথাও কোথাও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা সামনে এসেছে।
অভিযোগ আছে, আগের শাসনামলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ছাত্রনেতারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। তবে কর্তৃপক্ষ এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
শিক্ষাবিদরা এসব ঘটনাকে ‘অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতারা দাবি করছেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষকদের’ ‘অতীতের অসদাচরণের’ জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতেই তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি)। গত ১০ জানুয়ারি ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) কয়েকজন নেতা এক সহকারী অধ্যাপককে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জোর করে প্রক্টরের কার্যালয়ে নিয়ে যান।
আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান তখন ভর্তি পরীক্ষার তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় চাকসুর কয়েকজন নেতা তাকে ধরে নিয়ে যান। একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, তাকে টেনে-হিঁচড়ে একটি রিকশায় তুলে প্রক্টরের কার্যালয়ের দিকে নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, আমি খুবই সীমিত এক আইনি পরিসরের মধ্যে কাজ করছি। আইন অনুযায়ী এগুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অধীনে পরিচালিত। তবে কাউকে আক্রমণ, হয়রানি বা ভয়ভীতি দেখানোর অধিকার কারও নেই।’
চবি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রোমান আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন রোমান।
ভিডিওতে দেখা গেছে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক মেহেদী হাসান সোহান, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ, নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমান, সহ-যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক ওবায়দুল সালমান এবং সহকারী ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস রিতাকে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চাকসু সাধারণ সম্পাদক ও চবি শিবিরের আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব বলেন, কোনো শিক্ষককে হয়রানি করা হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাদের শুধু ‘শিক্ষক’ বলে উপস্থাপন করে প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রোমান অতীতে সহকারী প্রক্টর হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে বহিষ্কার করেছিলেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা উল্লেখ করে সাঈদ বলেন, এই ধারা অনুযায়ী কোনো সাধারণ নাগরিকও আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের সময় কাউকে আটক করতে পারে। তিনি দাবি করেন, আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিইনি। আমরা তাকে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কেউ যদি মনে করেন যে একটি আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তাহলে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই তাকে আক্রমণ বা নির্যাতন করা যাবে না।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া ও লাঞ্ছিত করার দৃশ্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে ‘জুলাইয়ের গণহত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার’ অভিযোগ তুলেছে, আবার একজন প্রক্টর তাকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং সেগুলো কেবল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সম্মানসূচক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন।
১০ জানুয়ারির ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, কেউ যদি আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না করে, তাহলে আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারি না।
তবে তিনি স্বীকার করেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এর আগে গত ৪ জুলাই একদল শিক্ষার্থী চবি উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের কার্যালয়ে ঢুকে তাকে ভয়ভীতি দেখায়। তারা বলে, আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’
সেদিন সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীকে তিন ঘণ্টা উপাচার্যের কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থী চাপের মুখে তার পদোন্নতি প্রক্রিয়াও স্থগিত করা হয়।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর। সেদিন ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রন্টু দাশকে প্রায় দুই ঘণ্টা বিভাগীয় সভাপতির কার্যালয়ে আটকে রাখা হয় এবং ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এই তিনটি ঘটনাতেই চবি শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ পারভেজ, প্রচার সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁইয়া এবং সাবেক অফিস কার্যক্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুল্লাহ খালেদ উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর এক সমাবেশে রাকসু সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার ঘোষণা দেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট কোনো শিক্ষক-কর্মকর্তা চাকরি করলে তাদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ছয়জন ডিনের পদত্যাগ দাবি করেন। একে একে ফোন করে আগে থেকে তৈরি করা পদত্যাগপত্রে সই করতে বলেন।
সেদিন শিক্ষার্থীদের একটি দল ডিনস কমপ্লেক্স ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। সেখানে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে শিবিরের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়।
ওই রাতেই ছয় ডিন পদত্যাগ করেন।
এই পদত্যাগকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, শিক্ষার্থীরা যখন এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, প্রমাণ ছাড়া কাউকে আন্দোলনবিরোধী হিসেবে রাজনৈতিকভাবে ট্যাগ করা ঠিক নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকদের হয়রানির ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়েরের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী আওয়ামী লীগপন্থি ‘নীল দল’-এর তিন শিক্ষককে হয়রানি করে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে এই ঘটনা ঘটে, যখন অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীন, অধ্যাপক আজমল হোসেন ভূইয়া ও অধ্যাপক জিনাত হুদা ক্লাস নিতে বাধা পাওয়া শিক্ষকদের আবার দায়িত্বে ফেরানোর দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক জামালকে ধাওয়া করছেন এবং তার গাড়ি আটকে দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে জুবায়ের বলেন, তিনি ও কয়েকজন ডাকসু সদস্য ‘ফ্যাসিবাদের দোসরদের’ পুলিশে সোপর্দ করতে অনুষদে গিয়েছিলেন।
এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী গোষ্ঠীগুলো কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল বাছির এবং জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এ কে এম মাহবুব হাসানকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার এসব ঘটনাকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কোনো অভিযোগই শিক্ষককে ভয়ভীতি বা হামলার শিকার করার বৈধতা দেয় না।
মন্ত্রণালয় কেন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি—এ প্রশ্নে তিনি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আইনি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আমি খুবই সীমিত এক আইনি কাঠামোর মধ্যে কাজ করছি। এগুলো ইউজিসি-নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও কাউকে আক্রমণ, হয়রানি বা ভয় দেখানোর অধিকার কারও নেই।
বর্তমান সংকটের জন্য তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ‘লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি’কে দায়ী করেন। তিনি বলেন, এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। আগের সরকার এটি চর্চা করেছিল, কিন্তু নতুন সময়ে এসে এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
এদিকে, বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একে ‘মব জাস্টিস’হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
ঢাবির বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’ বলেছে, অভিযোগ থাকলে তা আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে, সহিংসতার মাধ্যমে নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের ‘আইন বহির্ভূত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের’ নিন্দা জানিয়ে তাদের শিবির-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি তাদের ছাত্রসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, নির্বাচনের আগে এই ছাত্রনেতারা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলকতার মুখোশ’ পরলেও বিজয়ের পর তাদের ‘সহিংস ও শিক্ষাবিরোধী চেহারা’ স্পষ্ট হয়েছে। আমরা দেখছি, এ প্রতিনিধিরা ভাঙচুরে উসকানি দিচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অদক্ষ প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতাতেই শিক্ষার্থীরা যা খুশি তা করার সাহস পাচ্ছে।
অতীতের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ আমলে যে ‘ট্যাগিং সংস্কৃতি’ ছিল, তা এখন আরও সহিংস রূপ নিয়েছে।
তার মতে, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপরাধ, দুর্নীতি বা হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, তা দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ‘সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য’।
চবির ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি জানান, ইউজিসি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এমনভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না যে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে শোকজ নোটিশ দিতে পারে।
তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতির দিকেও ইঙ্গিত করেন। বলেন, শুধু নিয়ম-কানুন দিয়ে সুস্থ সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না। শিক্ষকরা যখন শিক্ষার্থীদের নিজেদের সন্তান হিসেবে দেখেন না, আর শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের তেমনভাবে দেখে না, তখনই এই সম্পর্ক ভেঙে পড়ে।
