বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণে অস্বাভাবিক বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত-সমালোচিত। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) ঋণে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যে এমআরটি-৬ নির্মাণ করা হয়েছিল, তার পেছনে সমসাময়িককালে নির্মিত অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যাশা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয়ের চর্চার অবসান ঘটবে। কিন্তু প্রথম আলোর সংবাদ অনুসারে, ঢাকায় নতুন দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানি ঠিকাদাররা প্রতি কিলোমিটারে যে ব্যয় হাঁকাচ্ছে, তা উত্তরা-মতিঝিল পথের দ্বিগুণেরও বেশি।
রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিলো ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পথে পরিকল্পিত এমআরটি-১ ও সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি-৫ (উত্তর) মেট্রোরেল নির্মাণে খরচ দাঁড়াবে কিলোমিটারে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। এত বেশি ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ করা হলে যাত্রীদের ওপর যেমন ভাড়ার চাপ বাড়বে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতে ঋণের বোঝাও বাড়বে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় অংশই বিদেশি ঋণ-নির্ভর। এসব প্রকল্পে ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে ‘দাতা সংস্থা’ এবং প্রদত্ত ঋণকে ‘সহায়তা’ হিসেবে উল্লেখ করার একটি চল রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব ঋণের উদ্দেশ্য কতটা গ্রহীতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা, আর কতটা ঋণদাতা দেশের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও রপ্তানি বৃদ্ধি তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক সময়, যে দেশ ঋণ দেয় তাদের সংস্থাই প্রকল্পের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরামর্শকের কাজ করছে, আবার ঠিকাদার হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়নও করছে। প্রকল্পের বেশিরভাগ কেনাকাটাও হচ্ছে ঋণদাতা দেশ থেকে। এতে প্রকল্পের লাভ-লোকসান যাচাই যেমন নিরপেক্ষ ভাবে হয় না, তেমনি প্রকল্পের খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এতে ঋণদাতা দেশের করপোরেশনগুলো লাভবান হলেও প্রকল্পের উচ্চ-ব্যয় ও যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঋণগ্রহীতা দেশের জনগণ। বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্প যার আদর্শ উদাহরণ।
মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে জাইকার ঋণে। নির্মাণ কাজের দরপত্র দলিল তৈরি ও মূল্যায়নে মূল ভূমিকা পালন করছে জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোই। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঋণ ও দরপত্রের শর্ত এমনভাবে দেওয়া হয় যেন জাপানি কোম্পানির জন্য কাজ পাওয়া সহজ হয়, অন্য কোনো দেশের কোম্পানি আর প্রতিযোগিতাই করতে না পারে। যেমন: এমআরটি-১ প্রকল্পের দরপত্রে টানেল বা পাতালপথ নির্মাণে ‘ওয়ান পাস জয়েন্ট’ পদ্ধতি প্রয়োগের শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা জাপানি ঠিকাদারের জন্য সুবিধাজনক। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের জাপানি স্টিল ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা মূলত জাপানের তিনটি কোম্পানি উৎপাদন করে। অন্য দেশের একই মানের স্টিল ব্যবহার করতে হলে ঠিকাদারকে অবশ্যই জাপানি রোড অ্যাসোসিয়েশন থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
এসব শর্তের কারণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেও জাপানের বাইরের কোনো ঠিকাদার পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘুরে ফিরে জাপানি দু-তিনটা ঠিকাদার চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়। তারা যে দর প্রস্তাব করে, সেটিই মেনে নিতে হয়। এর ফলে জাইকার ঋণে নির্মিত মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয় সমসাময়িককালে আশপাশের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে।
যেমন: এমআরটি-৬ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ ভারতে উড়ালপথে এই ধরনের মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় কিলোমিটারে ১৫০ কোটি টাকা আর পাতাল পথে সর্বোচ্চ ৪৫০ কোটি টাকা। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশের চেয়ে কম। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বিশ্লেষণ অনুসারে, প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে তুরস্কে ৬৭২ কোটি টাকা, আইভরিকোস্টে ৪৪৮ কোটি টাকা, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ৭৮৪ কোটি টাকা, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ৭৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। জাইকার ঋণের শর্তে যেভাবে ঢাকার পরবর্তী দুটি মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ এর জন্য ঠিকাদার নির্ধারণ করা হচ্ছে, তাতে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তো বেশি বটেই, এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ আমলে নির্মিত এমআরটি-৬-এর প্রায় দ্বিগুণ।
ভারতও বিদেশি ঋণে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা গ্রহণ করে না, যা ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ণ করে। এর ফলে দেখা যায় বিদেশি ঠিকাদারদের বদলে অনেক ক্ষেত্রে সেই দেশের ঠিকাদাররাও কাজ করে। এতে ব্যয়ও কম হয়। যেমন: জাইকার ঋণে ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনায় মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজের মূল ঠিকাদার সব ভারতীয়। পাতালপথের এই মেট্রো নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ৪৫০ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থার অন্যায্য শর্ত মেনে নেওয়ার কারণে মারাত্মক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।
মেট্রোরেলের বাড়তি নির্মাণ ব্যয়ের কারণ হিসেবে জাইকার পক্ষ থেকে উচ্চ গুণগত মান রক্ষার কথা বলা হয়। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাতকারে জাইকার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়াজাকি কাতসুরা বলেছেন, ‘উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন অবকাঠামো হলো, যার প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় বেশি, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত ব্যয় কম। এটার উদাহরণ হলো, যেমন ঢাকা মেট্রোরেল। এটি উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন প্রকল্পের একটি উদাহরণ।’
জাইকার এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, জাইকার ঋণে ভারতের পাটনায় যে পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হচ্ছে ৪৫০ কোটি টাকা। এই খরচ বাংলাদেশের সম্ভাব্য খরচের আট ভাগের এক ভাগ। তাহলে কি সেখানে জাইকা উচ্চ গুণগত মান রক্ষা করছে না? দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের প্রতিবেদন অনুসারে, মতিঝিল-উত্তরা মেট্রোরেল ব্যবস্থায় ৪৫টি ত্রুটি ও ঘাটতি রয়েছে, যা উচ্চ গুণগত মানের নিদর্শন নয়। এর মধ্যে সংকেত ও টেলিযোগাযোগ কাজে ১০টি, বৈদ্যুতিক কাজে ১৬ ধরনের, পুরকৌশল কাজে ১০ ধরনের এবং ট্রেন ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থাপনায় ৯ ধরনের ত্রুটি ও ঘাটতি রয়েছে। এই প্রতিবেদন অনুসারে, ১৬টি স্টেশনের অন্তত ৮৯টি জায়গায় বৃষ্টির পানি ঢোকে; অনেক স্টেশনে ট্রেন নির্দিষ্ট জায়গায় না থেমে কিছুটা আগে-পরে থামে; ডিপো এলাকায় রেললাইনে মরিচা পড়েছে; ট্রেনের ‘সেন্সরে’ ত্রুটির কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে; শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়েছে বহুবার; টিকিটি ভেন্ডিং মেশিন ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ঘনঘন নষ্ট হয়; মানহীন বিয়ারিং প্যাড ও নকশার ত্রুটির কারণে ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে।
এ ছাড়া, বাড়তি ব্যয়ের কারণ হিসেবে কাজের পরিধি বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির যে যুক্তি দিয়েছে জাইকা সেটাও যথার্থ কিনা তা যাচাই করতে উন্মুক্ত দরপত্র ডাকতে হবে। টাকার মূল্যমান কমে যাওয়া ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি শুধু জাপানি ঠিকাদারের বিষয় নয়। সবার দর প্রাক্কলনেই এর প্রভাব পরার কথা। জাপানি কোম্পানিসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানির মধ্যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হলেই কেবল জানা সম্ভব প্রকৃত খরচ কত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের রাজধানীতে যানজট সমস্যার সমাধান হিসেবে মেট্রোরেল নির্মাণ যে প্রয়োজন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে অস্বাভাবিক বাড়তি ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বিদেশি সংস্থা ঋণ দিলেই তার অযৌক্তিক শর্ত মানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কারণ, ঋণের অর্থ জনগণের করের অর্থ থেকেই পরিশোধ করতে হয়। আবার নির্মাণ ব্যয় বেশি হলে জনগণকেই বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। কাজেই মেট্রোরেল নির্মাণে অবশ্যই উন্মুক্ত দরপত্র ও যথাযথ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য দেশের তুলনায় অস্বাভাবিক বাড়তি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যেন উন্নয়নের নামে দেশের জনগণের অর্থ শুধু অন্য দেশের ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যয় না হয়।
কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন।
[email protected]
