26 C
Dhaka

ইরানে সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণ হয় যেভাবে

প্রায় ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ায় দেশটির ভবিষ্যৎ শাসনক্ষমতার ‘ভরকেন্দ্র’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আজ রোববার সকাল থেকেই এ সংক্রান্ত জটিল সব সমীকরণ সামনে আসতে শুরু করেছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে সাধারণ মানুষদের ধারণা খুব একটা স্পষ্ট নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দেশটিতে সর্বোচ্চ নেতার পরিবর্তন মাত্র একবারই ঘটেছে। বিপ্লবের রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৮৯ সালে ৮৬ বছর বয়সে মারা গেলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আলি খামেনি দায়িত্ব দেন। সেবার ধর্মীয় পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। যদিও তখন তিনি সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ধর্মীয় মর্যাদায় পৌঁছাননি। পরে সংবিধান সংশোধন করে তার নির্বাচনের পথ তৈরি করা হয়।

এবার এমন সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো যখন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে ইরানের শীর্ষ সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধেও নিহত হয়েছিলেন বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার, সামরিক বাহিনীর প্রধান ও কয়েকজন শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী।

বার্তা সংস্থা এপি জানায়, বর্তমানে ইরানে একটি অস্থায়ী পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণ করবে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী ইতোমধ্যে তিন সদস্যের এই পরিষদ গঠিত হয়েছে। তারা দেশের শাসনকার্য ও নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবে।

পরিষদে অন্তর্ভুক্ত ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি ইজেজি ও এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল মনোনীত অভিভাবক পরিষদের সদস্য আলি রেজা আরাফি।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও বিচার বিভাগীয় প্রধান মোহসেনি ইজেজি ‘সাময়িকভাবে নেতৃত্বের সব দায়িত্ব’ পালন করবেন বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সময়ে অস্থায়ী পরিষদ শাসনভার গ্রহণ করলেও, ইরানের আইন অনুসারে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল যত দ্রুত সম্ভব নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে।

এই প্যানেলটি সম্পূর্ণ শিয়া ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত হয়। এই প্যানেলের সদস্যরা প্রতি আট বছর পরপর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। তবে তাদের প্রার্থিতা অনুমোদিত হতে হয় সাংবিধানিক নজরদারি সংস্থা ‘অভিভাবক পরিষদের’ মাধ্যমে। এই সংস্থাটি কোনো প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে।

গত বছর ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকেই আলি খামেনির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, ওয়াশিংটন খামেনির অবস্থান জানত কিন্তু তাকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল না।
বার্তা সংস্থাটি আরও বলছে—২০২৪ সালে ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ প্যানেল নির্বাচনে আলি খামেনির অনুগতরাই সব কয়টি পদে জয়ী হন।

সংবিধান অনুযায়ী, এই প্যানেলই নতুন নেতা নিয়োগ দেবে। যদিও আইনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে কোনো প্রার্থী দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তাত্ত্বিকভাবে এই অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদই অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরান শাসন করতে পারে।

বিশেষজ্ঞ প্যানেলের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকলেও চূড়ান্তভাবে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবী গার্ডসহ সবগুলো সংস্থার কাছে উত্তরসূরিকে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে ধর্মীয় পর্যালোচনা ও বিভিন্ন যুক্তি সাধারণত নাগরিকদের আড়ালে হয়ে থাকে। এ কারণে শীর্ষ নেতা কে হতে পারেন তা অনুমান করা কঠিন। আগে ধারণা করা হতো যে, খামেনির প্রিয়ভাজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এই পদের একজন প্রধান দাবিদার। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।

এরপর খামেনির ছেলে ৫৬ বছর বয়সী শিয়া পণ্ডিত মোজতাবা খামেনি একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসেন। যদিও তিনি কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে বাবার পর ছেলের ক্ষমতা গ্রহণ ইরানি জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। এটিকে অনেক ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া শাহ আমলের মতো নতুন ‘ধর্মীয় রাজবংশ’ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হতে পারে বলেও এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরানের সাবেক বিচার বিভাগীয় প্রধান সাদেক আমোলি লারিজানি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির নাম এসেছিল।

বিশেষজ্ঞ পরিষদের কয়েকজনকেও সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের মধ্যে ধর্মীয় পণ্ডিত আলিরেজা আরাফিও আছেন। তিনি ইরানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও ধর্মীয় পদমর্যাদায় অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে খামেনি তাকে অভিভাবক পরিষদে নিযুক্ত করেন এবং ২০২৪ সালে তিনি বিশেষজ্ঞ পরিষদের দ্বিতীয় ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করেন।

এ ছাড়াও, প্যানেলের ফার্স্ট ডেপুটি চেয়ারম্যান হাশেম হোসেইনি বুশেহরি, মহসেন আরাকি ও মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি উত্তরাধিকারের তালিকায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।

অন্যদিকে, প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি সংস্কারবাদী ও মধ্যপন্থিদের পছন্দের প্রার্থী। তার ধর্মীয় যোগ্যতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য গুরুত্ব বহন করলেও, সীমিত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের কারণে তার সম্ভাবনা ততটা উল্লেখযোগ্য নয়।

Related Articles

Latest Articles