-4.3 C
New York

গ্রেট ফাদারল্যান্ডের ভূত: ভেনেজুয়েলায় চাভিসমো অধ্যায় কি শেষ?

গত আড়াই দশক ধরে ভেনেজুয়েলার রাজনীতি পরিচালিত হয়ে আসছে বামপন্থী জনতাবাদী মতাদর্শ চাভিসমো দ্বারা। যার শিকড়ে আছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই মতাদর্শ ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে তীব্র সংঘাতপূর্ণ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পর চাভিসমো এখন অস্তিত্ব সংকটে।

যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে, কারাকাসের অন্তর্বর্তী সরকারকে এখন ওয়াশিংটনের নির্দেশ মানতে হবে। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে—যে মতাদর্শ একসময় লাতিন আমেরিকাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ কী?

প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুগো চাভেজের নামানুসারে চাভিসমোর জন্ম ‘গ্রেট ফাদারল্যান্ড’ ধারণা থেকে। উনিশ শতকে স্প্যানিশ উপনিবেশবাদ থেকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ভেনেজুয়েলার সামরিক কর্মকর্তা সিমন বলিভারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চাভেজ দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে আগ্রাসী সামাজিক সংস্কার এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের জাতীয়করণের উদ্যোগ নেন।

১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তার শাসনামলে চাভেজ পুঁজিবাদকে ‘শয়তানের পথ’ বলে আখ্যা দেন। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় চাভেজ বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাদ হলো শয়তানের পথ এবং শোষণের নাম।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু সমাজতন্ত্রই মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি প্রকৃত সমাজ গড়ে তুলতে পারে।

শুরুতে ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। ইউরোপীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের ২০১৩ সালের মার্চের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাভেজের শাসনামলে দেশটির দারিদ্র্য ৫০ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্য ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। এর বড় অংশই এসেছিল জাতীয়করণকৃত তেল শিল্পের প্রবৃদ্ধি থেকে।

এই মতাদর্শ চাভেজের ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা ছাড়াও দূর-বামপন্থী ও সামরিক বিভিন্ন শক্তির সমর্থন পায়। ফলে তৈরি হয় এক বৈচিত্র্যময়—যদিও প্রায়ই অস্থিতিশীল—রাজনৈতিক জোট।

তবে ফ্রান্সের আভিনিওঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক গবেষক ইয়োলেত্তি ব্রাচো বলেন, ‘চাভিসমোকে একটি সুসংজ্ঞায়িত সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন, কারণ এটি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়।’

সমালোচকদের মতে, প্রাথমিক সাফল্যে পেলেও মাদুরোর শাসনামলেই চাভিসমো তার মূল চেহারা হারাতে শুরু করে। চাভেজ যেখানে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলতেন, সেখানে তার মনোনীত উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরোর শাসনকাল চিহ্নিত হয় কর্তৃত্ববাদী সংহতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে।

চাভিসমোর আদর্শ যেখানে নব্য-উদারবাদী নীতি পরিহার করে গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল, সেখানে মাদুরোর শাসনে অর্থনীতি উল্টো সংকুচিত হতে শুরু করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুযায়ী, মাদুরোর শাসনে ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির আকার প্রায় ৮০ শতাংশ ছোট হয়ে আসে।

এ ছাড়া চাভিসমোর মানবিক প্রতিশ্রুতি চাপা পড়ে দমনমূলক কৌশলের অভিযোগে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো মানবাধিকারকর্মীদের দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী নেতাদের নির্বিচার আটক করার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

চাভেজের মৃত্যুর পর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কর্মসূচি পরিচালক রেনাটা সেগুরা আল জাজিরাকে বলেছিলেন, ‘মাদুরোর শাসনামলে এই শাসনব্যবস্থা তার মতাদর্শিক সামঞ্জস্যের বড় অংশ হারায়। দুর্নীতি, রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট চাভিসমোকে ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে পরিণত করেছে, যা দ্রুতই ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রায় সব সমর্থন হারায়। এটি টিকে আছে মূলত দুর্নীতি ও রাজনৈতিক-সামরিক অভিজাত মহলদের স্বার্থে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা ‘চালানো’র দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চাভিস্তা সরকারের অবশিষ্ট অংশগুলো প্রতিরোধের বার্তা দিচ্ছে। চাভেজ-মাদুরো উভয়ের ঘনিষ্ঠ অনুগত, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ চাভিসমোর আদর্শ রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন।

তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা আর কখনো কোনো সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হবো না।’ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের দাবির পরও জোর দিয়ে বলেন, কোনো ‘বিদেশি এজেন্ট’ দেশ শাসন করছে না।

মাদুরোর মার্কিন-বিরোধী মনোভাব এবং নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় দেওয়া অর্থনৈতিক প্রণোদনার কারণে কিছু সমর্থক এখনও শাসকগোষ্ঠীর প্রতি অনুগত রয়েছেন। অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে মাদুরোর কঠোর শাসনের বিরোধিতা করা পক্ষ—যাদের ডাকা হয় ‘চাভিস্তা নো-মাদুরিস্তা’— তারা মূল সমাজতান্ত্রিক দর্শন রক্ষার চেষ্টা করে আসছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ না করলে দেলসি সরকার যেকোনো সময় উৎখাত হওয়ার আতঙ্কও রয়েছে।

বর্তমান অচলাবস্থা ভেনেজুয়েলার জনগণকে এক ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন করেছে। ইয়োলেত্তি ব্রাচো সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে দমনমূলক এক চাভিস্তা সরকার বহাল থাকবে, অথচ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডার কাছে নতি স্বীকার করবে।’

ব্রাচোর মতে, দেশটিতে এখনো এক হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। দমন-পীড়নের কারণে আতঙ্কে আছেন প্রবাসে থাকা জনগোষ্ঠীও। ভেনেজুয়েলার জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া তাই অত্যন্ত জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন হলো, চাভিসমো কি কার্যকর একটি মতাদর্শ হিসেবে টিকে থাকতে পারবে, নাকি এটি কেবল টিকে থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি অলঙ্কারিক হাতিয়ার হয়ে গেছে?

ট্রাম্প প্রশাসন যখন নামমাত্র হলেও কোনো সমাজতান্ত্রিক শাসনের বিরোধিতা করছে, তখন ওয়াশিংটনের দাবি ও কারাকাসের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শিকড়ের সংঘাত ইঙ্গিত দেয়—ভেনেজুয়েলার আত্মার জন্য লড়াই এখনো শেষ হয়নি।

চাভিসমোর বর্তমান অবস্থাকে বোঝাতে একে একটি পুরোনো বিশাল বাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায়।

হুগো চাভেজ সামাজিক সংস্কারের ইট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আবেগের সিমেন্ট দিয়ে বাড়িটির ভিত্তি গড়েছিলেন। কিন্তু মাদুরোর সময়ে ছাদে ফাটল ধরে এবং দমন-পীড়নের লোহার শিকলে ঢেকে যায় দেয়ালগুলো।

এখন যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক বাড়ির মালিকানা দখল করতে চাইলে, ভেতরে থাকা মানুষগুলো চরম দ্বিধাগ্রস্ত—চাভিসমো নামের এই বাড়িটি কি এখনও জনগণের, নাকি শুধু ক্ষমতাযন্ত্রের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার গোপন ফর্দ।

Related Articles

Latest Articles