ভেনেজুয়েলার শীর্ষ মাদক পাচার চক্র বলে দাবিকৃত ‘কার্টেল দে লস সোলস’-এর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। যদিও কথিত এ অভিযোগের ভিত্তিতেই দেশটিতে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বাস্তবে ‘কার্টেল দে লস সোলস’ কোনো সংগঠনের নাম নয়, এটি একটি কথ্য শব্দ, যা মাদকের অর্থে পরিচালিত একটি ‘পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থা’ এবং ‘দুর্নীতির সংস্কৃতি’-কে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মাদুরোকে নিয়ে একটি বিতর্কিত দাবি থেকে সরে এসেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। গত বছর তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ভিত্তি তৈরির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন যে দাবি করেছিল—মাদুরো ‘কার্টেল দে লস সোলস’ নামে একটি মাদক কার্টেলের নেতা—বিচার বিভাগ এখন সেই দাবি প্রত্যাহার করেছে।
এই অভিযোগের সূত্র ২০২০ সালে বিচার বিভাগের দায়ের করা একটি গ্র্যান্ড জুরি অভিযোগপত্র, যেখানে মাদুরোর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওই অভিযোগপত্রের ভাষা অনুকরণ করে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ‘কার্টেল দে লস সোলস’-কে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। পরে নভেম্বরে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও স্টেট ডিপার্টমেন্টকেও একই পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন।
তবে লাতিন আমেরিকার অপরাধ ও মাদক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ‘কার্টেল দে লস সোলস’ আসলে কোনো সংগঠন নয়। এটি ১৯৯০–এর দশকে ভেনেজুয়েলার গণমাধ্যমে প্রচলিত একটি কথ্য শব্দ, যা মাদকের অর্থে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
গত শনিবার প্রশাসন মাদুরোকে আটক করার পর বিচার বিভাগ একটি সংশোধিত অভিযোগপত্র প্রকাশ করে, যেখানে কার্যত এই বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, নতুন অভিযোগপত্রে প্রসিকিউটররা এখনো মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগ রেখেছেন, তবে ‘কার্টেল দে লস সোলস’-কে একটি বাস্তব সংগঠন হিসেবে উপস্থাপনের দাবি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে বলা হয়েছে, এটি মূলত একটি ‘পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থা’ এবং মাদকের অর্থে পরিচালিত একটি ‘দুর্নীতির সংস্কৃতি’-কে নির্দেশ করে।
আগের অভিযোগপত্রে যেখানে ৩২ বার ‘কার্টেল দে লস সোলস’-এর উল্লেখ ছিল এবং মাদুরোকে এর নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। নতুন অভিযোগপত্রে মাত্র দুবার এই শব্দটি এসেছে এবং বলা হয়েছে, তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মতো মাদুরোও এই পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থায় অংশ নিয়েছেন, একে টিকিয়ে রেখেছেন এবং সুরক্ষা দিয়েছেন।
নতুন অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মাদক পাচার থেকে অর্জিত অর্থ এবং পাচারকারীদের সুরক্ষার সুবিধা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত বেসামরিক, সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যায়, যারা শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত একটি পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থার অংশ—যাকে ‘কার্টেল দে লস সোলস’ বা ‘কার্টেল অব দ্য সানস’ বলা হয়। এটি ভেনেজুয়েলার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের ইউনিফর্মে থাকা সূর্য চিহ্নের প্রতি ইঙ্গিত করে।’
এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘কার্টেল দে লস সোলস’-কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে হোয়াইট হাউস এবং বিচার, পররাষ্ট্র ও ট্রেজারি বিভাগ এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক উপপরিচালক এলিজাবেথ ডিকিনসন বলেন, নতুন অভিযোগপত্রে ‘কার্টেল দে লস সোলস’-এর যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা ‘বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ’, যা ২০২০ সালের অভিযোগপত্রে ছিল না।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় নতুন অভিযোগপত্র সঠিক, কিন্তু অভিযোগগুলো এখনো বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হয় না—এটাই পার্থক্য। স্পষ্টতই তারা জানত, আদালতে এটি প্রমাণ করা সম্ভব নয়।’
