শিল্পগোষ্ঠী ট্রান্সকম গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ১২০ কোটি ৩০ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া এবং নীতি বিভাগ ও তদন্ত অধিদপ্তরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিঠি চালাচালির কারণে বিষয়টি নিষ্পত্তিতে ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে বড় অঙ্কের রাজস্ব দাবির বিষয়টি আইনি জটিলতায় পড়ে যেতে পারে।
তদন্তে যা উঠে এসেছে
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ট্রান্সকম লিমিটেড দক্ষিণ কমলাপুরের ঠিকানায় ভ্যাট নিবন্ধন নেয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এনবিআরের ভ্যাট গোয়েন্দা ও নিরীক্ষা দল প্রতিষ্ঠানটির ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কার্যক্রমের ওপর অনুসন্ধান শুরু করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি উঠে আসে।
তদন্তে অভিযোগ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত চলাকালেই নিজেদের ভ্যাট নিবন্ধন সংশোধন করে সেবাকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর (আইটি) সেবা হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। এর ফলে যেখানে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধের কথা ছিল, সেখানে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রদান শুরু করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের কারণে সরকারের সুদসহ প্রায় ৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আর যদি এই শ্রেণি পরিবর্তন না করা হতো, তাহলে ট্রান্সকমের ভ্যাট দায় দাঁড়াত প্রায় ১২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটি হিসাবপত্রে “ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স” নামে একটি খাত ব্যবহার করেছে। তদন্তকারী দলের দাবি, এটি প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যয়ের খাত নয়; বরং আয়ের অর্থ সেখানে দেখানো হয়েছে, যা ভ্যাট ফাঁকির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তদন্তে ধীরগতি ও নীতি বিভাগের মতামতের অপেক্ষা
ট্রান্সকমের ব্যাখ্যার পর ভ্যাট নিরীক্ষা অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে আইনি ও নীতিগত ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ভ্যাট নিরীক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন এনবিআরের মূসক নীতি বিভাগের কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চান, “ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স” খাতের ওপর ১৫ শতাংশ নাকি ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হবে।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় সচিবের মাধ্যমে আবারও জরুরি ভিত্তিতে নীতি বিভাগের মতামত চাওয়া হয়। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকেও বিষয়টির অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়।
এর আগে ৬ মে দেওয়া এক চিঠিতে মহাপরিচালক জাকির হোসেন জানান, বোর্ডের আনুষ্ঠানিক মতামত না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কমিশনারেট ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। পরে বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্তব্য নিতে ব্যর্থ এনবিআর
ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল মামুনও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, মূসক নীতি বিভাগের কর্মকর্তা মো. আজিজুর রহমান বলেন, ট্রান্সকমের ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা হবে।
অন্যান্য অভিযোগও আলোচনায়
ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের পাশাপাশি ট্রান্সকম গ্রুপকে ঘিরে অতীতের বিভিন্ন বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের এক প্রতিবেদনে ট্রান্সকমের সম্পদ ও শেয়ারসংক্রান্ত অনিয়ম, আরজেএসসিতে জমা দেওয়া নথিপত্রের সত্যতা এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে ট্রান্সকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হলেও তিনি এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শেয়ার জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলায় সিমিন রহমানসহ সংশ্লিষ্ট আসামিরা আদালত থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। ফলে ওই অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। যদিও সেগুলো নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই প্রায় ১২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ নতুন করে ট্রান্সকম গ্রুপকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ট্রান্সকমের ব্যাখ্যা
তবে ট্রান্সকম গ্রুপ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, “ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স” নামে উল্লেখিত অর্থ আসলে আইটি সাপোর্ট সার্ভিস থেকে অর্জিত আয়, যা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার আওতায় পড়ে। তাদের মতে, বিদ্যমান ভ্যাট আইন অনুযায়ী এ ধরনের সেবার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, সংশ্লিষ্ট সময়ের জন্য প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে এবং যে ভ্যাট কমিশনারেটের মাধ্যমে এই অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেও কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। তাই এনবিআরের আগের দাবিনামা সংশোধন করে নতুন দাবিনামা জারির অনুরোধও জানায় ট্রান্সকম।
