29.1 C
Dhaka

রাত ৩টায় ঘুম ভাঙে, থাকতে পারে প্রাচীন অভ্যাসের যোগসূত্র

গভীর রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখা গেল—রাত ৩টা। অনেকেই তখন অস্থির হয়ে ভাবতে শুরু করে, ‘এই অসময়ে কেন ঘুম ভাঙল?’ কিংবা ‘শরীরে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?’ কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, রাতের এই জেগে ওঠা সব সময় অসুস্থতার লক্ষণ নয়। বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে মানুষের হাজার বছরের পুরোনো ঘুমের অভ্যাস।

একসময় মানুষ একটানা আট ঘণ্টা ঘুমাত না। ইতিহাসবিদদের গবেষণা বলছে, বিদ্যুৎ, স্মার্টফোন কিংবা কৃত্রিম আলোর যুগ আসার বহু আগে পৃথিবীর নানা সংস্কৃতিতে মানুষের ঘুম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল।

সূর্য ডোবার কয়েক ঘণ্টা পর তারা ঘুমাতে যেত। তারপর মাঝরাতে একবার জেগে উঠত। সেই সময় কেউ আগুনে জ্বালানি দিত, কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্প করত, কেউ প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা করত, আবার কেউ প্রার্থনা বা ধ্যান করত। এক থেকে দুই ঘণ্টা জেগে থাকার পর তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ত এবং ভোর পর্যন্ত সেই ‘দ্বিতীয় ঘুম’ চলত।

ঘুম নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ রজার একির্চ প্রাচীন দলিল, চিকিৎসাবিষয়ক লেখা, আদালতের নথি, ব্যক্তিগত চিঠি ও কবিতাসহ দুই হাজারেরও বেশি ঐতিহাসিক নথিতে এই ‘প্রথম ঘুম’ ও ‘দ্বিতীয় ঘুম’-এর উল্লেখ খুঁজে পেয়েছেন। এমনকি হোমারের ওডিসিতেও এর ইঙ্গিত রয়েছে। সে সময় বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে, লেখকেরা এর আলাদা কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করতেন না।

কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর সবকিছু বদলে যেতে শুরু করে। ঘরে ঘরে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বাড়ল। মানুষ রাত জেগে কাজ করতে লাগল। ঘুমানোর সময় পিছিয়ে গেল। ধীরে ধীরে দুই পর্বের ঘুম মিলেমিশে একটানা রাতের ঘুমে পরিণত হলো। আর আজ আমরা ধরে নিয়েছি, একটানা রাতভর না ঘুমাতে পারলেই বুঝি সমস্যা।

আধুনিক ঘুমবিজ্ঞান বলছে, মানুষের ঘুম আসলে একটানা গভীর থাকে না। প্রতি ৯০ থেকে ১১০ মিনিট পরপর ঘুমের একটি চক্র সম্পন্ন হয়। এক রাতে সাধারণত চার থেকে ছয়টি চক্রের মধ্য দিয়ে যায় আমাদের শরীর।

রাতের প্রথম ভাগে গভীর ঘুম বেশি থাকে। কিন্তু রাত যত গড়ায়, গভীর ঘুম কমে আসে এবং হালকা ঘুম ও স্বপ্ন দেখার পর্যায় বাড়তে থাকে। এই সময় সামান্য শব্দ, আলো বা শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনেও ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

মজার বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষই রাতে কয়েকবার জেগে ওঠে। তবে কয়েক সেকেণ্ড বা মিনিটের মধ্যেই আবার ঘুমিয়ে পড়ে বলে সকালে তা মনে থাকে না। সমস্যা তখনই হয়, যখন সেই জেগে থাকার সময় দীর্ঘ হয়ে যায় অথবা প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম ভেঙে যায়।

১৯৯২ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এমন পরিবেশে রাখা হয়েছিল, যেখানে কোনো ঘড়ি বা কৃত্রিম আলো ছিল না। কয়েক দিন পর দেখা গেল, তাদের অনেকেই স্বাভাবিকভাবেই দুই পর্বে ঘুমাতে শুরু করেছে।

২০১৭ সালে মাদাগাস্কারের এমন একটি কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা করা হয়, যাদের এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। গবেষকেরা দেখেন, তাদের অনেকের ঘুম এখনো দুই ভাগে বিভক্ত।

অর্থাৎ আধুনিক জীবনযাত্রা বদলালেও মানুষের শরীরে সেই প্রাচীন ছন্দের কিছুটা এখনো রয়ে যেতে পারে।

এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল, রাত ৩টার দিকে কর্টিসল নামের একটি হরমোন হঠাৎ বেড়ে যায় বলেই মানুষ জেগে ওঠে। কর্টিসল শরীরকে সকালে জাগিয়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে ২০২৫ সালের একটি নতুন গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে। গবেষকেরা দুই শতাধিক মানুষের শরীরে সরাসরি কর্টিসলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, ঘুম ভাঙার মুহূর্তে কর্টিসল হঠাৎ বেড়ে যায় না। বরং এটি নিজের স্বাভাবিক গতিতেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তা মানুষ জেগে থাকুক কিংবা ঘুমিয়ে থাকুক।

অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই রাত ৩টার জেগে ওঠা কোনো অস্বাভাবিক হরমোনের কারণে নয়; এটি শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়িরই একটি অংশ হতে পারে।

তবে সব ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক না। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর পেছনে নির্দিষ্ট শারীরিক কারণও থাকতে পারে।

মেনোপজের সময় অনেক নারীর ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ায় গভীর ঘুম ব্যাহত হয়। পাশাপাশি রাতের গরম অনুভূতি (হট ফ্ল্যাশ) এবং হরমোনের পরিবর্তন ঘুম ভেঙে দিতে পারে।

আবার রাতের খাবার খুব কম খাওয়া বা অনেক আগে খেয়ে ফেললে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যেতে পারে। তখন শরীর স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে, যা অনেকের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও অন্যদের মধ্যেও হতে পারে।

এ ছাড়া বিকেলে বা সন্ধ্যায় ক্যাফেইন গ্রহণ এবং রাতে অ্যালকোহল পান করলেও ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ঘুম ভাঙার চেয়ে বড় সমস্যা হলো, ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া। অনেকেই তখন ঘড়ির দিকে তাকায়, হিসাব করতে থাকে, ‘এখনো তো তিন ঘণ্টা ঘুমানো বাকি!’ এরপর শুরু হয় দুশ্চিন্তা। আর এই উদ্বেগই মস্তিষ্ককে শেখাতে থাকে যে, রাত ৩টা মানেই জেগে থাকার সময় নয়। ধীরে ধীরে এটি দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের জৈবঘড়িকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। ঘুমানোর আগে মোবাইল বা অন্যান্য নীল আলোর পর্দা এড়িয়ে চলা, বিকেল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন না খাওয়া এবং অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকাও উপকারী।

যদি কেউ রাতের বেলা প্রায় ২০ মিনিটের বেশি জেগে থাকে, তাহলে বিছানায় শুয়ে অস্থির না থেকে উঠে কোনো বই পড়া বা অন্য কোনো কাজ করা ভালো। ঘুম এলে আবার বিছানায় ফিরে যেতে হবে। এতে বিছানাকে জেগে থাকার জায়গা হিসেবে মস্তিষ্কের মনে রাখার প্রবণতা কমে।

দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া (সিবিটি-আই) সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

রাত ৩টায় ঘুম ভেঙে যাওয়া মানেই শরীরে বড় কোনো সমস্যা হয়েছে এমন নয়। অনেক সময় এটি মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসেরই পুরোনো ছাপ হতে পারে, যা এখনো আমাদের শরীরে রয়ে গেছে।

সূত্র: সায়েন্স এলার্ট

Related Articles

Latest Articles