25 C
Dhaka

স্বাস্থ্য খাতের বাজেটে কেন জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ জরুরি

আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্যে উন্নয়নের কথা বলা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছরই একই কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। তত্ত্বগতভাবে সব সরকারই স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে। এটি যে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সেই কথাও স্বীকার করে। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

উন্নত বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে কেবল এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে তাদের বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশ কিংবা এর কাছাকাছি। কিন্তু আমাদের দেশে এই বরাদ্দ থাকে ১ শতাংশেরও নিচে।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এশিয়ায় স্বাস্থ্য খাতে গড় বাজেট যখন জিডিপির ৫ শতাংশ, তখন আমাদের দেশে তা মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। সাধারণ চোখে অনেকেই মনে করতে পারেন, আমাদেরও তো ৫ শতাংশ। কিন্তু মোট বাজেটের ৫ শতাংশ, আর জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক বাংলাদেশের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের কথা। সেই বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। একই অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, ২৪-২৫ অর্থবছরে বাজাটের আকার ছিল জিডিপির ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

ওই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ। জিডিপির দিক থেকে দেখলে বরাদ্দ ছিল শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যদি জিডিপির ৫ শতাংশ হতো, তাহলে সংখ্যায় তা হতো ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশের বেশি। অর্থাৎ জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ মানে মোট বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের মতো।

একটা দেশের সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য দরকার উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা। এই সেবা নির্ভর করে স্বাস্থ্য সূচকের ওপর। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটা সুস্থ-সবল জাতি গড়ে তোলা, যা জিডিপি বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করছে জিডিপির সঠিক বণ্টনের ওপর।

স্বাস্থ্য সূচক আমাদের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। স্বাস্থ্য সূচক মানে একটা দেশের সাধারণ পরিচ্ছন্নতার উন্নত মান, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হারে উন্নতি, জনগণের পুষ্টিমান, সুপেয় নিরাপদ পানির সরবরাহ ইত্যাদি। কাজেই স্বাস্থ্য সূচকে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে গেলে উপযুক্ত বাজেট বরাদ্দ ছাড়া তা অসম্ভব।

আমরা এটাও জানি, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমানো ছাড়া একটা দেশের গড় আয়ু বৃদ্ধি অসম্ভব। আর গড় আয়ু বৃদ্ধি করাই একটা উন্নত দেশের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।

কাজেই অপরাপর দেশের সরকার ঠিকই অনুধাবন করতে পারে যে, জাতীয় কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য দেখা যায়, প্রায় সব দেশ জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে। অন্তত ৩ শতাংশের বেশি রাখার চেষ্টা করে। অথচ আমাদের এখানে ভিন্ন চিত্র। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের বেশি ছিল। এরপরের বছরগুলোতে তা কমতে কমতে ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। অন্যথায় চিত্র ভিন্ন হতো।

স্বাস্থ্য খাতে নিম্ন বরাদ্দের ফল আমরা ইতোমধ্যে টের পাওয়া শুরু করেছি। বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বেড়েছে। বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ, যেমন: ম্যালেরিয়া, অপুষ্টি, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, জলাতঙ্ক, সাপে কাটায় মৃত্যুও বেড়েছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মৌলিক অনুপাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুচিকিৎসার জন্য চিকিৎসক-নার্স, নার্স-রোগী ও রোগী-হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার আনুপাতিক হার মানা উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, চিকিৎসক-নার্স অনুপাত ১:৩। কিন্তু আমাদের প্রকৃত চিত্র ১:০.৭। নার্স-রোগীর অনুপাত ১:৪ হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার ব্যাপারে তো সবাই জানেই।

কাঙ্ক্ষিত দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ) ও জনসংখ্যার অনুপাত হলো ২.৩:১০০০। আমাদের দেশে কেবল জনগণ ও চিকিৎসকের অনুপাত হলো, প্রতি ১০০০ জনে ০.৮৩ চিকিৎসক। নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়েনি।

দেশের ৭৫ ভাগ জনগণ বসবাস করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অথচ চিকিৎসক ঘনত্ব বেশি শহুরে এলাকায়। এতে করে গ্রামীণ জনপদে খুব কম জনগণই চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে সেবা পাচ্ছে। এটা বিশেষ সমস্যা।

বিভিন্ন দেশে চিকিৎসকদের মান উন্নত করতে বা ধরে রাখতে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৫ বছর পরপর প্রত্যেক চিকিৎসককে ফেডারেল মান পরীক্ষায় পাস করতে হয়। এতে করে চিকিৎসাদের মান বজায় থাকে, জনগণ উন্নত চিকিৎসা পায়। কিন্তু আমাদের এখানে সেই চিত্র দেখা যায় না।

উপরে উল্লেখ করা মৌলিক অনুপাতগুলো বজায় রাখতে ও পর্যবেক্ষণে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বাজেটের অভাবে এই জায়গাগুলোতে প্রতিনিয়তই সংকট রয়েছে। এটা সমাধানের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা ও বাজেট দুটোই দরকার। আমরা কখনোই এদিকে সঠিকভাবে নজর দেইনি।

জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিকবার বলেছেন, বিএনপি সরকারে গেলে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ জিপিডির ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। এখন সবাই সেটাই দেখার অপেক্ষায় আছে। যদি তারা সত্যিকার অর্থেই সেটা উপলব্ধি করে থাকেন, তাহলে অর্থ সংকট বা নানা জটিলতায় যদি ৫ শতাংশ নাও করতে পারেন, অন্তত কাছাকাছি কিছু করবেন।

সামনে বাজেট অধিবেশন রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো দরকার, শয্যা সংখ্যা বাড়ানো দরকার, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ দেওয়া দরকার। একইসঙ্গে প্রত্যেক রোগী যেন জরুরি ওষুধ পায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

বিশেষ নজর দিতে হবে আমাদের হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ আলাদা একটা হাইজিন ডিপার্টমেন্ট প্রতি হাসপাতালে উপযুক্ত জনবলসহ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে জনগণকে আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মুমূর্ষু রোগী অন্তত পক্ষে হাসপাতালে একটা শয্যা পাবে, বারান্দায় কিংবা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হবে না এবং জরুরি ওষুধ পাবে।

হাসপাতালের ওয়ার্ডে যারা রোগী হয়ে বা অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কখনো গেছেন, তারা যারপরনাই ভুক্তভোগী। কেননা বেশিরভাগ সময় শয্যা পাওয়া যায় না। শয্যা পেলে ওষুধ মেলে না। ওষুধ পেলেও প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসক কিংবা অপারেশনের সিরিয়াল মেলে না। ফলে দিনের পর দিন কাটাতে হয় হাসপাতালে। কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে শূন্য পদ পূরণ করে হাসপাতালের ওয়ার্ড পরিসর, প্যাথলজি সুবিধা ও ওটি কমপ্লেক্স বাড়াতে পারলে খুব সহজেই জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব।

অন্যদিকে টিকা কার্যক্রম নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ শুরু হয়েছে। এটি যেন সদা চালু থাকে, সেদিকে সঠিকভাবে নজর দিতে হবে। একইসঙ্গে শিশুর পুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করতে জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি চালু রাখতে হবে।

মোদ্দা কথা হলো, একটা দেশের সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য দরকার হলো পর্যাপ্ত বাজেট এবং তা হতে হবে ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত মানে। উন্নয়নশীল দেশের জন্য সেই মান হলো অন্তত জিডিপির ৫ শতাংশ বা মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ। তাহলেই স্বাস্থ্য সূচক মানে পৌঁছাবে, জনগণ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে।

সবশেষে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি। এটি যেহেতু সংবেদনশীল খাত, সেজন্য এই খাতে দুর্নীতি রোধ করতে আলাদা নজর দিতে হবে। এমন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে যেন স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকে আনার মাধ্যমে কেবল এটি অর্জন করা সম্ভব।

আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা তারা নেবে। সেই অপেক্ষাতেই আছে দেশের মানুষ।

ডা. সুশান্ত বড়ুয়া: চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কোভিড আইসোলেশন সেন্টারের সাবেক পরিচালক।

Related Articles

Latest Articles