-0.8 C
New York

ঘরছাড়া করেছিল পরিবার, ভালোবাসা ছাড়েনি হাত

চা বাগানের সরু পথ। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন এক নারী, হাতে ধরা আরেকজনের হাত। তিনি পথ দেখান, আর যিনি তার হাত ধরে হাঁটছেন, তিনি দেখেন না পৃথিবী। জন্ম থেকেই অন্ধ।

এই হাত ধরা শুধু পথ চলার জন্য নয়, ২৫ বছরের এক সংসার, এক ভালোবাসা, এক জীবনের দায় বয়ে চলার প্রতীক।

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা বাগানের ছোট্ট টিনের ঘরে থাকেন বাসমতি রানী রবিদাস ও তার স্বামী রামনারায়ণ রবিদাস। এলাকার মানুষ বাসমতিকে ‘পাগলি’ বলেই চেনে। আর সেই ‘পাগলিই’ হয়ে উঠেছেন এক জন্মান্ধ মানুষের চোখ, ভরসা, জীবনসঙ্গী।

চা বাগানে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হতো দুজনের। একসময় সেই কথাই রূপ নেয় ভালোবাসায়।

বাসমতি বলেন, ‘তার সঙ্গে কথা বললে মন ভরে যেত। কিন্তু আমার পরিবার কেউ তাকে মেনে নেয়নি। সবাই আমাকে পাগলি বলতো। একদিন ঘর থেকেই বের করে দিলো।’

আশ্রয়ের খোঁজে তিনি যান রামনারায়ণের কাছে। কিন্তু সেখানেও ঠাঁই হয়নি।

রামনারায়ণ বলেন, ‘বাবা বললেন—তোমার জন্মের ভাগী আমি, কিন্তু কর্মের ভাগী না। তারপর আমাকেও বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।’

দুজনেই হয়ে গেলেন ঘরছাড়া, শুধু ভালোবাসার অপরাধে।

প্রথম কয়েক মাস বাজারের গাছতলায় কেটেছে। ভিক্ষায় পাওয়া কাপড়েই দিন চলতো। পরে এক দয়ালু মানুষ বারান্দায় আশ্রয় দেন।

বাসমতির দিন শুরু হতো স্বামীকে দিয়ে—নাস্তা তৈরি, স্নান করানো, পোশাক পরানো—সব। তারপর তার হাত ধরে ভিক্ষায় বের হওয়া।

‘আমার মতো পাগলির কথা কেউ না শুনলেও, একজন তো শুনে’, বলতে বলতে হেসে ফেলেন বাসমতি।

রামনারায়ণের প্রথম স্ত্রী মারা যান সন্তান প্রসবের সময়, প্রায় ৩০ বছর আগে। তারপর হয়ে পড়েন ছন্নছাড়া। হঠাৎ দেখা পান বাসমতির।

‘আমার মতো অন্ধ মানুষকে আবার কেউ ভালোবাসবে, ভাবতেই পারিনি,’ বলেন তিনি।

স্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। বলেন, ‘তার কাঁধে হাত রেখেই চলি। তার চোখই আমার ভরসা।’

বিয়ের এক বছরের মাথায় জন্ম নেয় প্রথম সন্তান, পরে আরেক পুত্র। অভাব তখন চরমে।

‘অনেক সময় খাবারের অভাবে বুকে দুধ হতো না’, বলেন বাসমতি। প্রতিবেশীরা দুধ খাইয়ে দিতেন, কখনো সন্তান উপোষেই ঘুমিয়ে পড়তো।

তবু মানুষের দয়া তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কেউ শিশুকে দেখে খাবার দিত, কেউ খোঁজ নিত।

ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখার স্বপ্ন ছিল দুজনেরই। অনেক কষ্টে, এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটি অটোরিকশা কেনেন। পরিকল্পনা ছিল, ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। স্বপ্নটা বাঁচলো মাত্র ছয় মাস।

গত ৩১ ডিসেম্বর ভোরে ঘুম ভেঙে দেখেন, তালা ভাঙা, অটোরিকশা নেই।

রামনারায়ণের কণ্ঠ ভেঙে যায়। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘ভাবছিলাম আর ভিক্ষা করতে হবে না… কিন্তু ভগবান সে সুখও দিলো না।’

পাশে দাঁড়িয়ে বাসমতি বলেন, ‘এই অটোরিকশাটাই আছিল ভরসা। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।’

স্বজনদের অপমান, সমাজের তাচ্ছিল্য—সবই সহ্য করেছেন তারা।

প্রতিবেশী সুমন যাদব বলেন, ‘এতো অভাব, অপমান সত্ত্বেও শুধু ভালোবাসার জন্য সংসারটা ২৫ বছর টিকে আছে। বাসমতিকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।’

আজও ভোর হলে বাসমতি স্বামীর হাত ধরেন। পথ দেখান।

চোখে দেখতে পান না রামনারায়ণ, কিন্তু ভালোবাসা দেখতে পান।

আর বাসমতি—সমাজের চোখে ‘পাগলি’, কিন্তু এক জন্মান্ধ মানুষের জীবনে আলো হয়ে রয়েছেন।

Related Articles

Latest Articles