৯ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা। মিরপুর-১ ঈদগাহ মাঠের পাশে বড়সর জটলা। অনেক হইচই, আসছে ব্যান্ডপার্টির ছন্দময় উৎসবমুখর ঝংকার। রাস্তায় থেমে গেছে রিকশা, গাড়ি। পথচারীরাও থমকে গিয়ে উৎসুক হয়ে দেখছেন কী হচ্ছে।
হঠাৎ জটলার ভেতর থেকে বের হয়ে এল একটি ছাদখোলা গাড়ি। গাড়ি থেকে দাঁড়িয়ে রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে যাওয়া মানুষদের দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন এক নারী। পাশের ফুটপাতে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়েও হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দিচ্ছিল।
মা স্বপ্না আক্তার জানালেন, পাশেই তাদের বাসা। মেয়ে ব্যান্ডপার্টির শব্দ শুনে দেখার আবদার করায় বাইরে আসা। এসে দেখেন ‘তুলির’ গণসংযোগের মিছিল।
জানা গেল, নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিনে তুলির মিছিলটি শেষ হয় মিরপুর মাজারের সামনে। সেখান থেকে দলের নির্বাচনী কার্যালয়ে গিয়ে কিছু মিটিং শেষ করে বাসায় যান এই প্রার্থী।
তুলিসহ মোট ১৭ জন নারী প্রার্থী গত ২২ ডিসেম্বর থেকে ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে এভাবে প্রচার-প্রচারনা-মিছিল-মিটিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে সামনে রেখে।
তাদের অনেকের রাজনীতির বাইরে আলাদা পরিচয় আছে। অনেকেই যেমন প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা অন্য কোনো পেশাজীবী, অনেকে অধিকারকর্মী, আবার কেউ ব্যবসায়ী বা আইনজীবী। কেউ নির্বাচন করছেন কোনো দল থেকে, আবার কেউ করছেন স্বতন্ত্রভাবে।
পেশায় চিকিৎসক তাসনিম জারা বেশ কয়েক বছর ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেব অংশ নেওয়ায় ঢাকা-৯ আসনের বিভিন্ন এলাকায় গেলেই তাকে দেখা গেছে ১০-১৫ জনের একটি দল নিয়ে প্রচারণা চালাতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জারাকে ফলো করে প্রায় ৪৪ লাখ মানুষ। সম্প্রতি দক্ষিণ বনশ্রী দশতলা মার্কেটের সামনে তাসনিম জারার প্রচারণায় গিয়ে দেখা যায়, অনেকে তার কাছে এসে এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরছেন, কেউ আবার অভিযোগ করছেন।
সেখানে আসা বিভিন্ন বয়সের শিশু, তরুণ ও নারীরা তার সঙ্গে সেলফিও তোলার আবদার করেন। জারা মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শোনেন, আগ্রহীদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন।
সাভারের আশুলিয়ায় গাজীরচট এলাকায় এবরোথেবড়ো ভাঙাচোরা রাস্তায় ভরদুপুরে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ধুলোবালি গায়ে লাগিয়ে প্রচারণা চালানোর সময় দেখা এনসিপি প্রার্থী দিলশানা পারুলের সঙ্গে।
তার সঙ্গে তখন সেখানে ছিল সরকারের গণভোটের প্রচারণা চালানো একটি গাড়ি। সরু-আকাবাকা সড়কে লিফলেট বিলি করতে করতে যখন যাচ্ছিলেন পারুল, তখন সেখানে হাজির হন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকদের একটি দল। তারা পারুলের সঙ্গে কথা বলতে চান। কর্মী-সমর্থকদের একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তিনি বসে যান সাক্ষাৎকার দিতে।
দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও ৩০০ আসনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা খুবই হতাশাজনক।
মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৭৮ জন, যার শতকরা হার ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
এদিকে ঢাকায় মোট ১৯০ প্রার্থীর মধ্যে ১৭ জন নারী, শতকরায় প্রায় ৯ শতাংশ। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে ২ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে ২ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ২ জন, বিএনপি থেকে একজন, গনসংহতি আন্দোলন থেকে একজন, গনঅধিকার পরিষদ থেকে একজন, এবি পার্টি থেকে একজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি থেকে একজন, গনফোরাম থেকে একজন, জাতীয় পার্টি থেকে একজন ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি থেকে একজন।
এর মধ্যে, ঢাকা-৭, ৯, ১০ ও ১২ আসন থেকে দুজন করে এবং ঢাকা-১, ৫, ৮, ১১, ১৩, ১৪, ১৮, ১৯ ও ২০ আসনে একজন করে নারী প্রার্থী আছেন। ঢাকার ৭টি আসনে কোনো নারী প্রার্থী নেই।
ইতোমধ্যে নারী প্রার্থীরা কোনো কোনো আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, আবার কোথাও তাদের উপস্থিতি বিকল্প রাজনীতির বার্তা দিচ্ছে।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে আরও আছেন ঢাকা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা, ঢাকা-৫ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) শাহিনুর আক্তার সুমি, ঢাকা-৭ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির শাহানা সেলিম ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) সীমা দত্ত, ঢাকা-৮ আসনে গণঅধিকার পরিষদের মেঘনা আলম, ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও গণফোরামের নাজমা আক্তার, ঢাকা-১০ আসনে এবি পার্টির আইনজীবী নাসরীন সুলতানা ও জাতীয় পার্টি থেকে লেখক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বহ্নি বেপারী, ঢাকা-১১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি, ঢাকা-১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলন প্রার্থী শ্রমিক অধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. সালমা আক্তার, ঢাকা-১৩ আসনে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম, ঢাকা-১৮ আসনে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সাবিনা জাবেদ, ঢাকা-১৯ আসনে এনসিপির দিলশানা পারুল ও ঢাকা-২০ আসনে এনসিপির নাবিলা তাসনিদ।
এই নারী প্রার্থীদের অনেকেই ইতোমধ্যে রাজপথে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ রেখেছেন। তাসলিমা আখতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নিপীড়নসহ অসংখ্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি পোশাক শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করছেন এবং বর্তমানে দেশের পোশাক শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক তিনি।
গুমের শিকার ভাইকে খুঁজতে গিয়ে সানজিদা তুলি গড়ে তোলেন ‘মায়ের ডাক’ সংগঠন। তার অদম্য প্রত্যয়ে বাংলাদেশে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের ‘গুমের’ খবর পৌঁছে যায় বহির্বিশ্বে।
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলম ‘মিস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ নামে অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত বছরের এপ্রিলে বিনা মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে কারাগারে পাঠানো হলে আলোচনায় আসেন তিনি।
মেঘনা আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ওই মামলা আমার জীবনে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। ওই পরিস্থিতিতে আমার তিনটি উপলব্ধি আমাকে নির্বাচনের মাঠে এনেছে। আমি বুঝতে পারি যে আমাদের দেশে নাগরিক সুরক্ষা এতটাই ভঙ্গুর যে, একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র আমাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। মানুষের অসহায়ত্ব অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণ অপরিহার্য এবং আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।’
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, সংসদে নারী জনপ্রতিনিধি কম থাকা মানে আইন প্রণয়নে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা বাদ পড়া। আমাদের মতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এভাবে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা আড়াল হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারী আন্দোলনের নেতা শিরীন পারভিন হক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিভিন্ন সংকটে সাহসী নারীরা মাঠ ধরে রাখলেও দলগুলো তাদের সবাইকে যথাযথ মূল্যায়ন করছে না। রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নারী নেতৃত্ব তৈরির চর্চা নেই বলেই তারা বিভিন্ন অজুহাতে নারীদের মনোনয়ন দিতে অনীহা দেখান।’
জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কোনো দলই নির্ধারিত ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন নিশ্চিত না করায় আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারীর সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ খুবই কঠিন বলে জানান ঢাকা-১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিতে পেশিশক্তি বা এলাকা নিয়ন্ত্রণের চিন্তাভাবনা কাজ করে বেশি। সেখানে একজন নারীর ভোটের মাঠের লড়াইটা আসলে অধিকার আদায়ের আন্দোলনেরই অংশ।’
ভোটের মাঠের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল ও বহুমাত্রিক। মাঠপর্যায়ে অর্থ ও পেশিশক্তির দাপটের বাইরে অনলাইন বুলিং, চরিত্রহননের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পুঁজি করে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অপপ্রচার একটি অসম ও কঠিন নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করেছে।
সানজিদা তুলি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া বুলিং ও ফেক নিউজের চরম মাত্রা যেকোনো নারী প্রার্থীর জন্যই অসহনীয় হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেও দেখা গেছে এটি দমনে তাদের কার্যকর কোনো মেকানিজম নেই। পরিকল্পিত সাইবার বুলিং নারী নেতৃত্বের বিকাশে বিশাল বাধা।’
আরেক প্রার্থী জানান, সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে পুরুষ প্রার্থীদের মতো ভিড়ের মধ্যে যাওয়া নারী প্রার্থীদের জন্য প্রায়ই অসম্ভব, কারণ সেখানে হেনস্তা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। একইসঙ্গে, জনসভায় কথা বলা বা প্রচারণায় গেলে অনেকক্ষেত্রে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হয়।
তবে, দলীয় প্রার্থীরা দলের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে মাঠে সরব থাকতে পারলেও, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এটা অনেক কঠিন। তাসনিম জারা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর প্রথমে তা বৈধ ঘোষণা হয়নি। পরে আপিলে মনোনয়ন চূড়ান্ত হয় তার। ক্রাউড ফান্ডিং ও স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে তিনি প্রচারণা শুরু করেন ‘ফুটবল’ প্রতীকের।
‘পেশিশক্তি ছাড়া, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ছাড়া, শো-ডাউন ছাড়া আমার একটিমাত্র আসনও যদি প্রমাণ করতে পারে যে সৎ রাজনীতি দিয়ে জয়লাভ করা সম্ভব, তবে আমাদের গণতন্ত্রের ব্যাকরণই বদলে যাবে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন জারা।
তবে, পরিবার থেকে এই প্রার্থীরা শক্ত সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানান। তাদের মতে, পরিবার শক্তভাবে পাশে আছে বলেই তারা মাঠে থাকতে যথেষ্ট উৎসাহ পাচ্ছেন। নারী প্রার্থীদের আশা, জাতীয় সংসদ যেন নারীদের প্রকৃত দাবিগুলো তুলে ধরার জায়গা হয়।
শিরীন পারভিন হক বলেন, ‘শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নারীরা যে সাহসের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। জয়ী হতে পারুন বা না পারুন, তাদের এই প্রচেষ্টা পরবর্তী নির্বাচনে আরও অনেক নারীকে রাজনীতিতে আসার সাহস যোগাবে।‘
