-4.5 C
New York

বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানে মুগ্ধ নাসির হুসেইন

টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ যত কাছে আসছে, ততই পরিষ্কার হয়ে উঠছে, এই টুর্নামেন্ট এখন আর কেবল ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বোর্ডরুমের রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর বৈষম্যের বাস্তবতা। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ভেতরে জমে থাকা এই অস্বস্তিকর সত্য এবার প্রকাশ্যেই সামনে আনলেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসির হুসেইন।

স্পষ্ট ভাষায় নাসির হুসেইন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)-এর সমালোচনা করে বলেন, প্রভাবশালী বোর্ডগুলোর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণই বিশ্ব ক্রিকেটে ভারসাম্যহীনতা বাড়িয়ে তুলছে, আর এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো। আর তাই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অনড় অবস্থানও পছন্দ হয়েছে তার।

স্কাই স্পোর্টস পডকাস্টে মাইকেল আথার্টনের সঙ্গে আলাপচারিতায় নাসির হুসেইন অভিযোগ করেন, আইসিসি নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ থাকলেও বাস্তবে শক্তিশালী বোর্ডগুলোর প্রতি আলাদা আচরণ করছে, বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে। তার মতে, এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাই বিশ্ব ক্রিকেটকে ধীরে ধীরে একতরফা ও অসম কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি নাটকীয় ঘটনা। প্রথমেই আসে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের চুক্তি বাতিলের বিষয়টি, যার পেছনে বিসিসিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই সিদ্ধান্ত থেকেই তৈরি হয় ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া, বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে ভারত সফরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থানই এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যার পরিণতিতে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে দেয় আইসিসি।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন পাকিস্তানও ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয়। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই সিদ্ধান্ত পুরো টুর্নামেন্টকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে আইসিসির অবস্থান নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন নাসির হুসেইন। তিনি বলেন,  “ধরা যাক, টুর্নামেন্টের এক মাস আগে ভারত বলল, ‘আমাদের সরকার চায় না আমরা কোনো একটি দেশে বিশ্বকাপ খেলতে যাই।’ তখন কি আইসিসি একইভাবে কঠোর অবস্থান নিত? তখন কি বলত, ‘নিয়ম তো নিয়ম, দুর্ভাগ্য, তোমাদের বাদ দেওয়া হলো’?”

এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই নাসির মূল সমস্যাটিকে সামনে আনেন, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। তার ভাষায়, “সব পক্ষের একটাই দাবি, ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর ভারত -তিন দেশকেই একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। ভারতীয় সমর্থকেরা বলতে পারে, ‘আমাদের টাকা আছে, তাই শক্তি আছে।’ কিন্তু শক্তির সঙ্গে দায়িত্বও আসে। বারবার বাংলাদেশ বা পাকিস্তানকে কোণঠাসা করলে তাদের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারত–পাকিস্তান বা ভারত–বাংলাদেশের বড় ম্যাচগুলো একতরফা হয়ে গেছে।”

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি আসে আলোচনার শেষ অংশে। বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে নাসির হুসেইন বলেন, “আমি সত্যিই ভালো লেগেছে যে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছে, নিজেদের খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানও বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে, এটাও ভালো লেগেছে। একসময় তো কাউকে বলতে হবে, রাজনীতি অনেক হলো, এবার কি আমরা আবার শুধু ক্রিকেটে ফিরতে পারি না?”

এই সংকটের শিকড় আরও গভীরে। এর আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসির মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা হয়, আইসিসি ইভেন্টে ভারত ও পাকিস্তান কেবল নিরপেক্ষ ভেন্যুতেই মুখোমুখি হবে। কিন্তু সেই সমাধানও এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত গ্রুপ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যদিও ম্যাচটি নিরপেক্ষ ভেন্যুতেই হওয়ার কথা ছিল। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে এই সিদ্ধান্ত জানায়নি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি), ফলে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান নাজাম শেঠি। তিনি সরাসরি দায় চাপিয়েছেন বিসিসিআইয়ের ওপর। তার ভাষায়, “মূল সমস্যা বিসিসিআইয়ের মনোভাবেই। তারা প্রতিটি ধাপে অন্য বোর্ডগুলোর ওপর প্রভাব খাটিয়েছে। আগে পাকিস্তান একা ছিল, দশটির মধ্যে একজন, আর সবাই ভারতের পাশে দাঁড়াত। এখন সেই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে।”

শেঠি স্মরণ করিয়ে দেন বিতর্কিত ‘বিগ থ্রি’ মডেলের কথা, যেখানে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের হাতে ক্ষমতা ও রাজস্ব কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। “নয়টি বোর্ড সই করেছিল, আমরা একা বিরোধিতা করেছিলাম, কারণ এটা ন্যায্য ছিল না,” বলেন তিনি।

তিনি আরও তুলে ধরেন ভারত–পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজের প্রসঙ্গ, যেখানে শেষ মুহূর্তে সবকিছু ভেঙে পড়ে। শেঠির অভিযোগ, “এক বছর পর, সিরিজের ঠিক আগের দিন, বিসিসিআই কোনো বৈঠক ছাড়াই মুম্বাইয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা না করেই সরে দাঁড়ায়, এটা ছিল চরম অপমান।”

এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে বিসিসিআই সূত্র জানিয়েছে, ১৫ ফেব্রুয়ারির পাকিস্তান ম্যাচের জন্য ভারত দল শ্রীলঙ্কায় যাবে, সেখানেই অনুশীলন করবে এবং ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলন করবে।

Related Articles

Latest Articles