বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীরা অন্তত ৭২টি আসনে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলের ভোট বিভাজনের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। ১৭ বছরেরও বেশি সময় পর দলটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ এই বিরোধ বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, তিন ডজনেরও বেশি আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের পরিবর্তে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এবং দলীয় বিদ্রোহীদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
দফায় দফায় আলোচনা, বারবার সতর্কবার্তা এবং বহিষ্কারের পরও বিএনপি নেতৃত্ব বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। বরং বিদ্রোহী প্রার্থী এবং তাদের পক্ষে প্রচারণা চালানো স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এতে শঙ্কা বাড়ছে, ভোট বিভাজনের ফলে দল নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিএনপির নির্বাচনী স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘যারা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন, তাদের নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ক্রোধ বা ব্যক্তিগত কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন আমরা কোনো তথ্য পাই, তা যাচাই করি এবং তারপর ব্যবস্থা নিই। যারা দলের সিদ্ধান্ত মানবেন না, তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
মূল প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা
বাংলাদেশ জাতীয় দল ভেঙে বিএনপিতে যোগদানের পর সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যেখানে বহিষ্কৃত বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য এবং বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমান যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির প্রতিদ্বন্দ্বী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু, যিনি দলের দারুস সালাম থানা ইউনিটের আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
নোয়াখালী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী এবং দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মফিজুর রহমান।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়ছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোমিন আলী। অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনের প্রতিদ্বন্দ্বী বহিষ্কৃত নেতা ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কায়সার আহমেদের বিরুদ্ধে লড়ছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন, যিনি স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে লড়ছেন জেলা বিএনপির আরেক সাবেক সহ-সভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন।
দলীয় সূত্র জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারটি আসনে বিএনপির ছয়জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন, অন্যদিকে ময়মনসিংহ জেলার ১১টি আসনে সাতজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।
ময়মনসিংহ-২ আসনে দলের প্রার্থী ও উত্তর জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদারের বিরুদ্ধে লড়ছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারওয়ার। ময়মনসিংহ-১১ আসনে উপজেলা বিএনপির প্রার্থী ফখরুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে লড়ছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম।
জোট শরিকদের জন্য বিএনপি যেসব আসন ছেড়ে দিয়েছে, সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীরাও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হকের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব। তিনি ঢাকা উত্তর মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক।
পটুয়াখালী-৩ আসনটি বিএনপি গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। এই আসনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। এই আসনে বহিষ্কৃত বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা এখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
গতকাল দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন। এই বিদ্রোহীরা দল মনোনীত প্রার্থীদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এই বিদ্রোহী প্রার্থীরাও কিন্তু বিএনপির। যদি তারা জয়ী হয়, দল তাদের প্রতি নরম মনোভাব দেখাতে পারে।’
তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ
গত সাত দিনেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে বিএনপি ছয় ডজনেরও বেশি তৃণমূল নেতাকে বহিষ্কার করেছে, যার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
বহিষ্কৃত বেশ কয়েকজন নেতা বলছেন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তারা বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা অবশ্য স্বীকার করছেন, এতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে।
তারা অভিযোগ করছেন, মনোনয়ন দেওয়ার সময় দলীয় হাইকমান্ড তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করেছে, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি।
গত সোমবার বহিষ্কৃত ১৭ জন নেতার মধ্যে রয়েছেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির। তিনি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি ইউনিটের সভাপতি এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যপদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
মনির এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘তৃণমূল নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ধরে দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। হামলা ও মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের বহিষ্কার করা ভালো সিদ্ধান্ত নয় এবং এটি দলের ক্ষতি করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বহিষ্কারের পরও আমি বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে যাব। আমরা অন্য দল থেকে আসা নতুন হাইব্রিড নেতাদের পক্ষে নই।’
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের বহিষ্কৃত নেতা মুজিবুর রহমানও মনিরের সুরেই কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি ৪৫ বছর ধরে রাজনীতিতে আছি এবং ৫০টিরও বেশি মামলা খেয়েছি। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী একজন হাইব্রিড নেতা, তাই আমরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করছি।’
মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির ছয় নেতাকে রুমিন ফারহানার পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালানোর জন্য বহিষ্কার করা হয়।
গতকাল দলটি নোয়াখালী-২ আসনের ১৮ জন স্থানীয় নেতাকে এবং মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের আটজনকে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার জন্য বহিষ্কার করে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের পৌর শাখার সদস্যসচিব এবং জেলার আহ্বায়ক কমিটির তিন সদস্য বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থনে পদত্যাগ করেছেন।
তাদের একজন আতোয়ার হোসেন বাবুল। তার অভিযোগ, দল ‘অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং যথাযথ নিয়ম না মেনে বহিষ্কারাদেশ জারি’ করছে।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এজন্য আমরা নিজেরাই পদত্যাগ করছি। আমরা কীভাবে এমন একটি দলের হয়ে কাজ করতে পারি, যে দলের মধ্যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চাও নেই।
‘আমরা যদি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করি, দল প্রথমে আমাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করতে পারত। কিন্তু এভাবে সরাসরি বহিষ্কার করা অগণতান্ত্রিক।’
