30 C
Dhaka

সংঘাতের ৪ বছর: অবিচল ইউক্রেন এবং বদলে যাওয়া বিশ্ব

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চার বছর পূর্ণ হচ্ছে ২৪ ফেব্রুয়ারি।

১ হাজার ৪১৮ দিন পেরোনো এই যুদ্ধ সময়ের বিচারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করতে যত দিন লেগেছিল, তার চেয়েও দীর্ঘ।

২০২২ সালে কিয়েভ দ্রুত দখলের লক্ষ্য নিয়ে রাশিয়ার সামরিক যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু এটি এখন ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্মুখসারির ক্ষয়যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে রাশিয়া।

চার বছরে যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেছে আমূল। সম্মুখ সমরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রোননির্ভর আধুনিক প্রযুক্তি। আকাশ ও সম্মুখসারি এখন ড্রোনের নজরদারিতে; গোপনে সেনা সমাবেশ প্রায় অসম্ভব।

বার্তা সংস্থা এপির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া আকাশ প্রতিরক্ষায় অপটিক্যাল ফাইবার-সংযুক্ত দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। আর এর ফলে সম্মুখসারি থেকেও ৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে।

তাই এখনো বড় আকারের আক্রমণের বদলে দুই বা তিন সদস্যের ক্ষুদ্র ইউনিট দিয়ে পদাতিক হামলা বাড়ছে।

আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমানো এবং জনবল সংকটের কারণে ইউক্রেন বড় আক্রমণ থেকে সরে এসে প্রতিরক্ষামূলক কৌশলে জোর দিয়েছে। অসম যুদ্ধনীতির অংশ হিসেবে তারা দীর্ঘপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করছে।

এরই মধ্যে সাহসী অভিযান এবং নৌ-ড্রোন হামলায় অধিকৃত ক্রিমিয়া থেকে রুশ নৌবহরকে সরিয়ে নিতে ইউক্রেন বাধ্য করেছে—এ ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।

এই আগ্রাসনের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ সৈন্য নিহত, আহত বা নিখোঁজ।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অনুমান, রাশিয়ার সামরিক হতাহত ১২ লাখ, যার মধ্যে ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা সর্বোচ্চ ৬ লাখ, যার মধ্যে নিহত ১ লাখ ৪০ হাজার।

বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও গভীর। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ইউক্রেনের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। অসংখ্য শহর ও জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকসহ একাধিক সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার চার বছরের আগ্রাসনে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইউক্রেনের আগামী এক দশকে প্রায় ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ২০২৫ সালের জিডিপির প্রায় তিন গুণ।

দেশটির রাস্তাঘাট, অবকাঠামও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুনর্গঠনের ব্যয়ের খাতভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি—আনুমানিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এরপর জ্বালানি ও আবাসন খাতে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার করে ব্যয় ধরা হয়েছে।

যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের প্রতি সাতটি বাড়ির মধ্যে অন্তত একটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান হারে হামলা করায় মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ গ্রিডে লক্ষ্যভিত্তিক এসব হামলার ফলে তীব্র ব্ল্যাকআউট দেখা দিয়েছে। কিয়েভের মতো শহরের বাসিন্দারা প্রতিদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে তীব্র শীত সহ্য করছেন।

ইউক্রেন মৌলিক সামরিক প্রয়োজন মেটাতে সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে পেরেছে। কিন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও লাগাতার বোমাবর্ষণের প্রভাব মানবীয় সহনশীলতাকে ক্রমাগত পরীক্ষার মুখে ফেলছে।

স্কাই নিউজ জানিয়েছে, সামরিক হতাহতের বাইরেও এই যুদ্ধ লাখো সাধারণ ইউক্রেনীয়ের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সম্মুখসারির কাছাকাছি বাস করা বেসামরিক নাগরিকরা ভারী গোলার হামলা ও বোমার আঘাতে তাদের শহরগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছেন।

দ্য ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়াও এই সংঘাতে জড়িয়ে নীরবে নিজেদের সামাজিক কাঠামো ও জনসংখ্যাগত স্থিতিশীলতাকে ক্ষয় করেছে। যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সরকার গভীর গোপনীয়তা অবলম্বন করছে। এমনকি ২০২৯ সাল পর্যন্ত সরকারি জনসংখ্যা জরিপ স্থগিত রাখা হয়েছে।

রাশিয়াতে মানসিক চাপও সমানভাবে বেড়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় আক্রান্তের সংখ্যা ২১ শতাংশ বেড়েছে এবং অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের প্রেসক্রিপশন বেড়েছে ১৮ শতাংশ।

ওই সংঘাত বৈশ্বিক রাজনীতিকেও বদলে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্বমুখী কৌশল নিয়েছেন।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি সই করেন পুতিন।

অন্যদিকে, ইউক্রেন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে।

তবে ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে এলে কূটনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিয়েছে বলে দাবি স্কাই নিউজের।

এরপর আবুধাবি ও জেনেভায় ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা শুরু হয়। যদিও ওই আলোচনায় এখনো বিশেষ অগ্রগতি নেই।

এদিকে আলাস্কায় ট্রাম্প বৈঠকও করেন পুতিনের সঙ্গে।

যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করলেও স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।

বিবিসি বলছে, পুতিন তাদের দখলকৃত চারটি অঞ্চলের স্বীকৃতি ও ইউক্রেনের ন্যাটো ত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে জেলেনস্কি বর্তমানে যুদ্ধবিরতি এবং কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চান, এরপরে গণভোটের কথা বলেছেন।

এপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার পর জুনে পূর্ব ইউক্রেনকে ‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ ঘোষণার মতো প্রস্তাব সামনে এনেছে।

তবে সক্রিয় লড়াই তখনই থামবে, যখন কোনো এক পক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারাবে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও সমন্বিত শান্তি চুক্তি ও নতুন ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়তে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার প্রয়োজন হবে।

Related Articles

Latest Articles