29 C
Dhaka

লিঙ্গ-বৈষম্য: ‘টি-বয়’ টেস্ট

কিছুদিন আগে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন আমার এক নারী সহকর্মী। কোম্পানির এক কর্মকর্তার রুমে বসার পর একজন টি-বয় এসে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, চা নাকি কফি?’ নিজের বসকেও একই প্রশ্ন করলেন। তারপর চলে গেলেন। কিন্তু, আমরা সহকর্মীকে এই প্রশ্নটি করলেন না। সহকর্মী আমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ‘দেখলেন, আমার কাছে জানতে চাইল না আমি কী চাই।’

দুঃখজনক সত্য হলো, আমিও বিষয়টি খেয়াল করিনি।

আমি খারাপ মানুষ বলে খেয়াল করিনি, বিষয়টি এমন না। এই সমাজ আমাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে, এসব বিষয় চোখে না পড়াটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

আমরা সাধারণত বৈষম্য তখনই দেখি, যখন সেটা নিয়ে জোর আওয়াজ তোলা হয় কিংবা সেটা অতি কুৎসিত বা খবরযোগ্য হয়ে ওঠে। অথচ বাংলাদেশে অধিকাংশ বৈষম্য নিয়ে আওয়াজ ওঠে না। সেগুলো হয় নিঃশব্দে। চায়ের ট্রে, মিটিংয়ের এজেন্ডা, বোর্ডরুমের নীরবতা, ঘরে রাতের খাবার কিংবা কোনো দোকানদারের আচরণে, যেখানে সিদ্ধান্ত স্ত্রী নিলেও কথা বলে স্বামীর সঙ্গে।

বহুজাতিক ওই কোম্পানির এই ঘটনার পর হঠাৎই মনে পড়তে থাকলো আমার স্ত্রীর সঙ্গে কাটানো নানা মুহূর্তের কথা। ব্যাংক, দোকান কিংবা হাসপাতালে আমার স্ত্রী পাশে থাকলেও পুরুষেরা আমার সঙ্গেই কথা বলতেন। বিষয়টা যেন এমন যে, আমার স্ত্রী হচ্ছেন মূল ফাইলের সঙ্গে সংযুক্ত কোনো নথি মাত্র। লজ্জার সঙ্গেই বলছি, বহুবার আমি বিষয়টি বুঝতেই পারিনি।

ওই দিনই আমরা আরেকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নারী সিএইচআরওর সঙ্গে দেখা করি। তিনি বলছিলেন, পুরুষ-প্রধান বোর্ডরুমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য কতটা কঠিন ছিল। শুধুমাত্র নিজের কথা শোনানোর জন্য তাকে পুরুষদের চেয়েও বেশি জোরে কথা বলতে হতো। একজন পুরুষ দৃঢ়ভাবে কথা বললে তাকে বলা হয় ‘আত্মবিশ্বাসী’। আর একজন নারী একইভাবে কথা বললে হয়ে যান ‘অতিরিক্ত আগ্রাসী’।

এক তরুণী সহকর্মী একবার সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে অফিসিয়াল সম্পর্ক বাড়াতে এক আড্ডায় যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আড্ডায় থাকা ছেলেরা চুপ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল যেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনো কর্তা সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। পদোন্নতি, প্রকল্প, আস্থা ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রায়শই চা, গল্পগুজব ও ‘ভাই-ব্রাদার’ নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়েই যায়। নারীরা যদি সেই আড্ডা থেকে বাদ পড়েন, তাহলে তারা এসব সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই এমন পরিস্থিতি ওই কোম্পানির ক্ষতি করে ফেলে। যে প্রতিষ্ঠান নারী কর্মীদের কথা শোনে না, তারা তো এক কান বন্ধ রেখেই সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তারা গ্রাহকের অভিজ্ঞতা, মেধা, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও শেষ পর্যন্ত মানুষই হারায়। সবার প্রতি ন্যায্য আচরণ কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার উপায়।

সবার প্রতি ন্যায্য আচরণ না হলে দেশেরও ক্ষতি। দেশের অর্ধেক মেধা যদি নিশ্চুপ ও অদৃশ্য হয়েই থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশ কখনোই স্মার্ট অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারবে না।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণে লিঙ্গ-বৈষম্য কমাতে পারলে মাথাপিছু জিডিপি গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার প্রায় ৫৩ শতাংশ, যেখানে পুরুষের ৮০ শতাংশ। এটি শুধু ‘নারীর জন্য সমস্যা’ নয়, এটি অর্থ মন্ত্রণালয়কেও ডুবিয়ে দেওয়ার মতো বড় এক অর্থনৈতিক ক্ষয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গবেষণায়ও দেখা গেছে, উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছালে লিঙ্গ-বৈচিত্র্যের সুফল দৃশ্যমান হতে শুরু করে।

শেখার মতো উদাহরণও রয়েছে। নর্ডিক দেশগুলো শিশুযত্ন, ছুটিনীতি ও কর্মজীবী নারীদের গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে তাদের কর্মশক্তিকে শক্তিশালী করেছে। ২০২৫ সালে জার্মানির বড় কোম্পানিগুলোতে নারী নেতৃত্বের হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান লিঙ্গ-ভারসাম্যকে কেবল লোক দেখানোর জন্য নয়, বরং কৌশলগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে।

তাহলে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, পুরুষদের এসব বিষয় দেখতে ও শিখতে হবে। প্রথম সংস্কার নীতিতে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। দ্বিতীয়ত, লিডার্স মিটিং, পরামর্শ, পদোন্নতি ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কগুলো এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, বাধাগ্রস্ত, বঞ্চিত, কম বেতন পাওয়া বা দায়িত্ব থেকে বাদ পড়া নারীদের উপেক্ষা করতে থাকলে ফুল দিয়ে নারী দিবস উদযাপন বন্ধ করতে হবে এইচআর বিভাগগুলোকে।

আমাদের নারী সহকর্মীরা সহানুভূতি চান না। তারা চান ন্যায্যতা। তারা পরিবার, দল, প্রতিষ্ঠান ও আমাদের জাতীয় বিবেক বহন করছেন। তারপরও অর্ধেক স্বীকৃতির জন্য তাদের দ্বিগুণ প্রমাণ দিতে হচ্ছে।

পরেরবার কোনো টি-বয় এলে বিপ্লব হয়তো শুরু হতে পারে একটি সাধারণ বাক্য দিয়ে, ‘দয়া করে সবার কাছে জানতে চান।’ কারণ, যদি আমরা এই সামান্য সিদ্ধান্তের জায়গাতেই নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে না পারি, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আমাদের বক্তব্যগুলো গালগপ্পোই হয়ে থাকবে।

লেখক: বিল্ডকন কনসালট্যান্সিজ লিমিটেড ও বিল্ডনেশন লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা।

Related Articles

Latest Articles