28 C
Dhaka

মোবাইল সাংবাদিকতা নাকি ডিজিটাল হয়রানি?

সাংবাদিকতার কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা; অন্যায়, বৈষম্য, জবাবদিহিহীনতা সামনে আনা। মোবাইল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সেই কাজকেই আরও দ্রুত, বিস্তৃত ও জনমুখী করার কথা ছিল। হাতে স্মার্টফোন থাকলে ঘটনাস্থল থেকে সঙ্গে সঙ্গে ছবি, ভিডিও, তথ্য পাঠানো যায়; বড় ক্যামেরা যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখান থেকেও খবর তোলা সম্ভব হয়। অর্থাৎ, মোবাইল সাংবাদিকতা হওয়ার কথা ছিল সাংবাদিকতার পরিসর বাড়ানোর শক্তিশালী হাতিয়ার।

কিন্তু বাংলাদেশে এর এক অস্বস্তিকর, কদর্য ব্যবহার প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে মোবাইল সাংবাদিকতা আর খবর সংগ্রহের মাধ্যম থাকছে না; সেটি ক্রমে মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের প্রকাশ্যে ছোট করা, হেনস্তা করা, আর কনটেন্ট বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

চিত্রটি খুব অপরিচিত নয়। কোনো নারী একটি অনুষ্ঠান, সমাবেশ বা জনপরিসরে গেছেন। তিনি হয়তো এক মুহূর্তের জন্য শাড়ি ঠিক করছেন, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, কিংবা রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ দেখা যায়, কাছেই কোনো ফোনের ক্যামেরা তাকেই ‘খবর’ বানিয়ে ফেলেছে। অনুষ্ঠান নয়, ঘটনাও নয়, মূল ফোকাস ওই নারী। তারপর শুরু হয় ভিডিও, রিল, স্থিরচিত্র, ক্যাপশন, ইঙ্গিত, ঠাট্টা, লজ্জা, আর ভেসে ওঠা চটকদার ‘সংবাদ’। দেখলেই বোঝা যায় এটি সাংবাদিকতা নয়, কেবলমাত্র অপমানজনক কনটেন্ট।

এখানে সমস্যা ক্যামেরা নয়। সাংবাদিকরা জনসমাগম ধারণ করবেন, সাধারণ মানুষও জনপরিসরের মুহূর্ত রেকর্ড করবেন—সেটাই স্বাভাবিক। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ক্যামেরা তথ্য দেওয়ার বদলে কারও অপ্রস্তুত মুহূর্ত উন্মুক্ত করার জন্য তাক করা হয়; যখন ঘটনা ব্যাখ্যার জন্য ফ্রেম বাছাই না করে বরং কাউকে বিব্রত করা হয়; যখন প্রেক্ষাপটের বদলে দর্শকের চোখকে নারীর শরীর, পোশাক বা ভঙ্গির দিকে ঠেলে দিতে ক্যাপশনের ব্যবহার করা হয়। সেই মুহূর্তেই একজন মানুষ কনটেন্টে পরিণত হন।

এই প্রবণতার বড় চালক এখন কিছু ফেসবুক পেজ, টিকটক অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব চ্যানেল ও ভুঁইফোড় ‘নিউজ পোর্টাল। তারা অপমানকে বিক্রির জিনিস বানিয়েছে। আরও অস্বস্তিকর সত্য হলো, মাঝে মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও একই ফাঁদে পা দিচ্ছে। তারা এমন ক্লিপ বা ছবি প্রকাশ করেছে, যার সঙ্গে জনস্বার্থের সম্পর্ক খুবই সামান্য। সেগুলো বরং কৌতূহল, দৃষ্টি ও শরীরী আগ্রহের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। ভুয়া পোর্টালগুলো কোনো নীতিমালা মানে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও যখন সাংবাদিকতার মানদণ্ড ভেঙে একই খেলায় নামে, তখন ক্ষতিটা অনেক গভীর হয়।

একটি পেজ তার নামের শেষে ‘টিভি’, ‘নিউজ’ বা ‘মিডিয়া’ জুড়ে দিলেই তা সাংবাদিকতা হয়ে যায় না। কাউকে অপমান করার ভিডিও বা ছবি আপলোড করা সাংবাদিকতা নয়। মানুষের দুর্বল মুহূর্তকে ভাইরাল করা জনস্বার্থ নয়। কারও লজ্জা, ভয় বা অস্বস্তিকে ‘কনটেন্ট’ বানানো সংবাদ নয়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক নারী আন্দোলনকর্মীকে আপত্তিকরভাবে ভিডিও করার অভিযোগে এক মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিককে শিক্ষার্থীরা প্রশ্নবিদ্ধ করেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী তাকে জিজ্ঞেস করছেন, কেন এমন ফুটেজ তিনি নিয়েছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির প্যাডে দেওয়া একটি মুচলেকার কথাও সামনে আসে। সেখানে বলা হয়, তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে জুম করে ওই নারীকে ধারণ করেছিলেন। তিনি ভুল স্বীকার করেন এবং মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। ঘটনাটি শুধু একজনের দোষের প্রশ্ন নয়; এটি দেখিয়েছে, সমস্যাটি পেশার ভেতরেই ঢুকে পড়েছে।

এই প্রবণতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির সময় অনেক ক্ষেত্রেই সেটাকে প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। ক্যামেরা, ফোন, লাইভ, বুম, মাইক্রোফোন—সব মিলে একধরনের জনসমক্ষে উন্মোচন। একই প্রবণতা দেখা যায় পুলিশের অভিযানে, বিশেষ করে হোটেল অভিযানে। মানুষকে তাদের সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ভিডিও করা হয়। কে অপরাধী, কে নয়, আদালত বলার আগেই ক্লিপ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। মুখ দেখানো হয়, পরিচয় ফাঁস হয়, কৌতুক হয়, রায় দিয়ে ফেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শুরু হয় মিডিয়া ট্রায়াল।

এই ক্ষতি কেবল নারীর শরীরকে পণ্য বানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শাহবাগে সমকামী সম্প্রদায়ের সদস্য বলে অভিযোগ তুলে কয়েকজনকে মারধরের ঘটনায়ও একই প্রবণতার অভিযোগ এসেছে। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, নিজেদের মোবাইল সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া কিছু লোক তাদের চলাচলে বাধা দেয়, অনুমতি ছাড়া ভিডিও করে, এমনকি হামলার মাঝেই অপমানজনক, অশালীন ও ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করতে থাকে। অর্থাৎ, মানুষের বিপদও এখন কনটেন্ট। ভয়, অপমান, আতঙ্ক, সামাজিক দুর্বলতা—সবই বাজারজাত করা যায়।

এটি কেবল নীতির প্রশ্ন নয়; এটি আইন, নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা স্পষ্ট করে বলছে, কোনো নারীর শ্লীলতাহানি বা গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে নারীর অপমানকে কনটেন্টে পরিণত করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব খুব কমই দেখা যায়। সাইবার আইন, ডিজিটাল নজরদারি, কনটেন্ট অপসারণ—এসব তখনই বেশি সক্রিয় দেখা যায় যখন রাজনীতি জড়িত থাকে বা ক্ষমতাবানদের স্বার্থে আঘাত লাগে। কিন্তু যখন নারী বা অন্য কোনো নাজুক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, তখন রাষ্ট্রের সেই তৎপরতা চোখে পড়ে না।

নিবন্ধিত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় আরও বেশি। সরকার যদি নিবন্ধন দেয়, তাহলে সেই বৈধতার অপব্যবহার হলে দায়ও তাকে নিতে হবে। সতর্কবার্তা, ব্যাখ্যা চাওয়া, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা—সবই সম্ভব। নিবন্ধন কখনোই শিকারি আচরণের ঢাল হতে পারে না।

আর অপরাধী যদি হয় এমন কোনো অনিবন্ধিত পেজ বা পোর্টাল, যারা নামের সঙ্গে ‘নিউজ’ লিখে মানুষের মর্যাদা হরণ করে, তাহলে রাষ্ট্রের দায় কমে না। বরং আরও স্পষ্ট হয়। সরকার ভুক্তভোগীর অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে না। অনেকেই হয়তো জানেনই না যে তাদের ছবি বা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, কনটেন্ট অপসারণ, প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয়, পুনরাবৃত্ত অপরাধী শনাক্তকরণ—এসবের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা দরকার।

একজন সাংবাদিক হিসেবেই এসব কথা আমি বলছি। কারণ, আমি দেখছি, এই সংস্কৃতি শুধু নারীদের নয়, সাংবাদিকতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিবার যখন অপমানকে ‘মিডিয়া’ নামের মোড়কে পরিবেশন করা হয়, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে। প্রতিবার যখন কোনো নারীকে নিউজ লোগোর নিচে টোপে পরিণত করা হয়, মানুষ সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা আরেকটু হারায়।

এ কারণে একে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন বলে পাশ কাটানো যাবে না। একজন নারীকে, কিংবা অন্য কোনো নাজুক মানুষকে শিকারি ক্যামেরার সামনে ঠেলে দেওয়া স্বাধীনতা নয়; এটি নিপীড়ন। আর শিকারি লেন্স থেকে কাউকে রক্ষা করার অর্থ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়, বরং নাগরিকের মর্যাদার অধিকার রক্ষা করা।

যদি মিডিয়ার নামে এসবকে প্রশ্রয় দিতে থাকি, তাহলে সাংবাদিকতা নিজেই সেই সমস্যার অংশ হয়ে উঠবে, যা তার উন্মোচন করার কথা ছিল।

লেখক: দ্য ডেইলি স্টারের একজন সাংবাদিক, যিনি শিক্ষা, সুশাসন, মানবাধিকার ও জনজবাবদিহিতা নিয়ে লেখালিখি করেন।
[email protected]
 

Related Articles

Latest Articles