যখন কোনো মুক্ত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক গণমাধ্যমে আগুন দেওয়া হয়, তখন আসলে পুড়ে যায় গণতন্ত্র। পুড়ে যায় মতের বৈচিত্র্য, ভিন্নমতের সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের অধিকার। সত্য অনুসন্ধানের জন্য বিতর্ক, যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির চর্চা, একই বিষয়কে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়। সৃজনশীল চিন্তাবিদ থেকে আমরা পরিণত হই অনুগত সেবকে।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া শীর্ষস্থানীয় দুটি পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোকে। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা।
যে দুটি পত্রিকা সব সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে এনেছে, ক্ষমতার দমনমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকাণ্ডের নিরলস সমালোচনা করেছে এবং শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছে, যাদের সম্পাদকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে—একজনের বিরুদ্ধে ৮৪টি মামলা ও অন্যজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, যাদের সাংবাদিকদের ২০১৪ সালের পর প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ও সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি, যারা সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যাদের মালিকানা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে, যাদের সংসদে দাঁড়িয়ে ‘দেশের শত্রু’ বলা হয়েছে, সেই দুই পত্রিকার অফিস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দুটি পত্রিকাই গুম, হেফাজতে মৃত্যু, পুলিশের নৃশংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবসময় গণতন্ত্র, বিরোধীদলের অধিকার ও ভিন্নমতের সংস্কৃতির পক্ষে ছিলাম এবং মানবাধিকারের ওপর যেকোনো ধরনের আঘাতের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছি। দুটি পত্রিকাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সংবাদমাধ্যমকে রুদ্ধ করা ও জনমত দমন করার সব প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালোভাবে লড়েছে।
আর এই দুই পত্রিকাকেই পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার জন্য আগুন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা ফিরে এসেছি একটিমাত্র প্রত্যয় নিয়ে—মাথা নোয়াবার নয়।
আগুন লাগানোর ভিডিওগুলোতে যাদের আগুন দিতে দেখা যায়, তাদের কাউকে সংবাদপত্রের পাঠক বলে মনে হয় না। ইংরেজি দৈনিকের পাঠক হওয়ার সম্ভাবনা তো আরও কম। তাহলে যারা আমাদের সংবাদপত্র পড়ে না এবং হয়তো কখনো পড়েইনি, তারা কীভাবে আমাদের প্রতি এত ঘৃণা পোষণ করতে পারে যে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে, সমাজ পরিচালনার মৌলিক নিয়ম ভেঙে, দেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত দুটি পত্রিকা পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ করতে পারে? ঘটনাগুলো যত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও সুচারুভাবে সংগঠিত। পরিকল্পনাকারীরা ‘উপযুক্ত’ সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ১৮ ডিসেম্বর রাতকেই তারা উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয়।
এরা কারা? কে বা কারা তাদের এমন মতাদর্শে দীক্ষিত করেছে, উসকানি দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য মাঠে নামিয়েছে?
আমাদের বিস্মিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের ভূমিকা। তারা আমাদের ভালোভাবে চিনতেন। তাদের মধ্যে অনেকে এই দুই পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট ছিলেন এবং অনেকেই বিভিন্ন সময়ে আমাদের জন্য লিখেছেন। তারা আমাদের সম্পর্কে জানতেন এবং আমাদের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গেও অতি পরিচিত ছিলেন। অনেকেই তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমাদের সহায়তা চেয়েছেন।
যখন আমাদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন তাদের প্রতিবাদের কণ্ঠ কোথায় ছিল, বিশেষ করে ১৮ ডিসেম্বরের পরে? তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের বিরুদ্ধে চলা অপপ্রচার সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন এবং জানতেন যে আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবুও তারা পত্রিকা দুটিকে আগুন থেকে রক্ষা করতে কিছুই করেননি। অথচ, এই পত্রিকাগুলোই তাদের সহায়তা করেছে, তাদের লেখা প্রকাশ করেছে এবং এর ফলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজনও হয়েছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা। আমরা এখনো মেনে নিতে পারি না যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অগ্নিসংযোগ ঠেকাতে পারেনি। অথচ, একটি পত্রিকায় আগুন লাগানোর পর সেই উন্মত্ত জনতা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিচ্ছিল যে তারা অন্যটিতেও হামলা করবে। দুই পত্রিকা অফিসে আগুন দেওয়ার মধ্যে প্রায় ৪০ মিনিটের ব্যবধান ছিল। নিশ্চয়ই কিছু করা যেত।
‘সততা, সাহসিকতা, সাংবাদিকতা’ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের ৩৫ বছরের এই যাত্রার গল্প কী? আমাদের প্রথম সম্পাদকীয়তে পাঠকদের কাছে অঙ্গীকার করেছিলাম, ‘… দ্য ডেইলি স্টারের শক্তি তার নির্দলীয় অবস্থানে… কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক বা প্রভাবমুক্ত থাকার স্বাধীনতায়। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো যে অবস্থানই নিক কিছুক্ষেত্রে আমরা নিরপেক্ষ থাকব না। ভালো সঙ্গে মন্দের দ্বন্দ্বে, ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায়ের বা সঠিকের সঙ্গে ভুলের দ্বন্দ্বে আমরা কোনোভাবেই নিরপেক্ষ থাকব না। কোনো রাজনীতিবিদই এই পত্রিকাকে হালকাভাবে নিতে পারবেন না, আমাদের নিষ্ঠা নিয়ে সন্দেহ করার মতো কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।’
মোটামুটি হিসাব করলে গত ৩৫ বছরে আমরা প্রায় ২৫ হাজার সম্পাদকীয় লিখেছি এবং প্রায় ৪২ হাজার মতামত প্রকাশ করেছি—প্রতিদিন গড়ে যথাক্রমে দুই ও চারটি। শুরু থেকেই আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। আমরা জনগণের অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের অধিকার এবং সব ধরনের দমনমূলক আইন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি। আমরা সবসময় সংসদকে নির্বাহী বিভাগের সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, ‘জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জায়গা’ হিসেবে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছি। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা, আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে রাজনীতিমুক্ত করা—এসব ক্ষেত্রেও আমরা নিরলসভাবে কাজ করেছি।
পরিবেশ নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে আমরা বিশেষভাবে গর্বিত। নদী দখল, ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ, বন সংরক্ষণ এবং বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ে আমরা অসংখ্য প্রতিবেদন ও ফটোফিচার করেছি। নারী ও শিশুর অধিকার, মানবাধিকার, তথ্য অধিকার, প্রতিবাদ ও ভিন্নমতের অধিকার নিয়ে আমরা শত শত গোলটেবিল বৈঠক ও সেমিনার করেছি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব ধরনের দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠ ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠগুলোর একটি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতার এক আলোকবর্তিকা হিসেবে এসেছে এবং আমাদের সেই স্বাধীনতার দিকেই এগোতে হবে। গণমাধ্যম পুড়িয়ে আমরা সেদিকে যেতে পারব না। এই গণঅভ্যুত্থানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী’। আমরা এটিকে দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান লক্ষ্য করতে চাই। ধনী-গরিবের ব্যবধান নির্মম ও অমানবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সেই স্রোত না ঘোরালে দরিদ্ররা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। শিক্ষা সর্বজনীন করা, দক্ষতা বিস্তার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, কৃষি উৎপাদনশীলতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিতকরণে এআইয়ের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এটা আমাদের সমাজকে এমনভাবে রূপান্তর করতে পারে যা এই মুহূর্তে ‘কল্পনা’ মনে হতে পারে। আমাদের চিন্তাধারা বদলে জনসংখ্যাকে প্রধান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উচ্চ উৎপাদনশীলতা সম্পন্ন প্রতিটি দক্ষ মানুষ বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে পারে। এআই আমাদের সেই পথে সাহায্য করতে পারে এবং করবে।
এর জন্য আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। দরিদ্রদের বোঝা নয়, সম্পদ ভাবতে হবে। আমাদের নীতিতে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন আনতে হবে।
দ্য ডেইলি স্টার বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র ও মুক্ত গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবসম্পদকেন্দ্রিক এই পথেই আমাদের ভবিষ্যৎ নিহিত। আমরা একটি নতুন সরকার ও তরুণ নেতৃত্ব পেয়েছি। ইতিহাস যে বিরল সুযোগ তাদের সামনে এনে দিয়েছে, তারা কি সেই উদ্ভাবন, সাহস ও দৃঢ়তা দেখাতে পারবে?
মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার
