25 C
Dhaka

ধর্ষণ কেবল অপরাধ নয়, সামাজিক সংকট

ছাপা পত্রিকা কিংবা অনলাইন পোর্টাল—গণমাধ্যমে চোখ রাখতে গেলেই কোথাও কিশোরী ধর্ষণ, কোথাও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর। ঘটনাগুলোও এত ঘনঘন ঘটছে যে বেশিরভাগ সময় এসব খবর আর আমাদের চমকে দেয় না।

অথচ এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ভয়াবহতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে ধর্ষণ আর কেবল অপরাধ নয়, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

গত কয়েক মাসের সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সেই উদ্বেগকেই স্পষ্ট করেছে। নারী অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংবাদমাধ্যমে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি।

এই পরিসংখ্যানের আরও ভয়াবহ দিক হলো, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই শিশু।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই তিন শতাধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

অর্থাৎ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সহিংসতা শুধু বাড়ছে না, ক্রমশ শিশুদের আরও বেশি গ্রাস করছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলো দেশের প্রায় সব প্রান্তেই ঘটছে—গ্রাম থেকে শহর, স্কুল থেকে কর্মক্ষেত্র। এমনকি পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে এসব অপরাধ।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি কয়েক ঘণ্টায় একজন নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম—যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় ও বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক পরিবারই অভিযোগ করতে চান না। ফলে যে সংখ্যাগুলো সংবাদমাধ্যমে আসে, সেগুলো আসলে সমুদ্রে ভাসমান বৃহৎ বরফ খণ্ডের চূড়া মাত্র।

ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি কেবল অপরাধের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।

অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কিংবা মামলা না করার জন্য চাপ তৈরি করে।

ধর্ষণ কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য আইনগত শাস্তি যথেষ্ট কঠোর। ২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না কেন?

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধ কমাতে আইনের কঠোরতার চেয়ে বেশি কার্যকর হলো বিচারের নিশ্চয়তা। অর্থাৎ অপরাধী যদি নিশ্চিতভাবে জানে যে সে ধরা পড়বে এবং দ্রুত শাস্তি পাবে, তখন অপরাধের প্রবণতা কমতে শুরু করে।

অন্তত ধর্ষণের মামলায় বাংলাদেশে সমস্যা এখানেই। তদন্তে বিলম্ব, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অধিকাংশ মামলাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক বার্তা তৈরি হয়—অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়।

প্রথমত, যৌন সহিংসতার মামলার জন্য বিশেষায়িত দ্রুত বিচার ব্যবস্থা প্রয়োজন। অনেক দেশে এ ধরনের মামলার জন্য আলাদা আদালত রয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করা হয়।

বাংলাদেশেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে এবং ১৮০ দিনের মধ্যে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এসব ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। কিন্তু, তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহসহ নানা দুর্বলতায় অনেক ক্ষেত্রেই আসামিরা আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যাচ্ছে। কিংবা মামলার দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে জামিন পেয়ে বাদী পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ফরেনসিক ও তদন্ত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। ডিএনএ পরীক্ষা, আধুনিক প্রমাণ সংগ্রহ পদ্ধতি এবং প্রশিক্ষিত তদন্তকারী দল অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার—যেখানে তারা আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং পেতে পারেন। অনেক দেশে এ ধরনের সমন্বিত সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে।

চতুর্থত, সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করা জরুরি। সাক্ষীরা নিরাপদ না হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।

পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলপর্যায় থেকেই সম্মতি, লিঙ্গসমতা ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ উন্নয়নের অনেক সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি বাড়ছে, অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, প্রযুক্তি এগোচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনও সামনে রয়ে গেছে—নারীরা কি নিরাপদ?

একটি সমাজের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যদি নারীরা রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারেন, যদি শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা সমাজের এক একটি ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও—সমস্যাটি স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এখনই।

জুবাইয়া ঝুমা, পিআর প্রফেশনাল
 

Related Articles

Latest Articles