29.9 C
Dhaka

গণশত্রু থেকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং: প্রকৃতি, মিডিয়া ও প্রতিরোধের গল্প

আমরা যখন পরিবেশ নিয়ে কথা বলি, তখন সাধারণত কিছু পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে—গলতে থাকা হিমবাহ, কাটা পড়া বন, প্লাস্টিকে ভরা সমুদ্র কিংবা ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া শহর। কিন্তু পরিবেশ আসলে শুধু ‘প্রকৃতি’র বিষয় নয়। এটি গল্পের বিষয়, ক্ষমতার ও মিডিয়ার বিষয়। আরও স্পষ্ট করে বললে—কে পৃথিবীর গল্প বলবে, আর কে শুধু সেই গল্পের ভুক্তভোগী হয়ে থাকবে—এই প্রশ্নও পরিবেশের অংশ।  

হলিউড বহু বছর ধরেই পৃথিবীর শেষ হয়ে যাওয়ার গল্প বানাচ্ছে। ‘দ্য ডে আফটার টুমরো’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘অ্যাভাটার’ কিংবা সাম্প্রতিক ‘ডোন্ট লুক আপ’—সব সিনেমাতেই পৃথিবী বিপদের মুখে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই সিনেমাগুলোর বেশিরভাগ সংকট গ্লোবাল হলেও তার নায়ক প্রায় সবসময়ই আমেরিকা। যেন পৃথিবী মানেই ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্ক। অথচ জলবায়ু বিপর্যয়ের সবচেয়ে বাস্তব গল্পগুলো ঘটছে ঢাকার উপকণ্ঠে, সুন্দরবনের পাশে, কলকাতার তাপদগ্ধ রাস্তায়, পাকিস্তানের বন্যায় কিংবা আফ্রিকার খরাপীড়িত গ্রামে। পৃথিবীর সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করা মানুষগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে। এটিই পরিবেশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো বহুদিন ধরেই বলে আসছে—‘তোমরা উন্নয়ন করেছ, আমরা মূল্য দিচ্ছি’। জলবায়ু পরিবর্তন এখানে শুধু তাপমাত্রার প্রশ্ন নয়; এটি ইতিহাসের প্রশ্ন। উপনিবেশবাদ, শিল্পায়ন, পুঁজিবাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘কার্বন সাম্রাজ্যবাদ’। গবেষকরা একে বলছেন ক্লাইমেট ইনজাস্টিস— যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলেই উপস্থিত নেই। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক অন্যায়ের সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণগুলোর একটি।

পৃথিবীর মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য। অথচ ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা আর জলবায়ু উদ্বাস্তু—সবকিছুর সবচেয়ে নির্মম অভিঘাত এখানেই। উপকূলের মানুষ শহরে আসছে। শহর তাদের জায়গা দিতে পারছে না। ফলে পরিবেশ সংকট একসময় সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

এই জায়গায় এসে পরিবেশ আর সমাজতত্ত্ব আলাদা থাকে না। সমাজতত্ত্ব আমাদের শেখায়—দুর্যোগ কখনও ‘সবার জন্য সমান’ নয়। ঢাকার ধনী এলাকার মানুষ এয়ার পিউরিফায়ার কিনতে পারে, কিন্তু বস্তির মানুষ দূষিত বাতাসই শ্বাস নেয়। দিল্লির অভিজাতরা হিটওয়েভের মধ্যে এসি চালায়, কিন্তু রাস্তায় কাজ করা শ্রমিকের শরীরই হয়ে ওঠে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার।

কিন্তু এই গল্পগুলো আমরা কীভাবে জানি? এখানেই আসে কমিউনিকেশন স্টাডিজ। 

মিডিয়া শুধু খবর দেয় না, মিডিয়া বাস্তবতাও তৈরি করে। কোন বিপর্যয় ‘বড় খবর’ হবে, কোন মৃত্যু ‘পরিসংখ্যান’ হয়ে থাকবে—তা অনেকটাই নির্ভর করে মিডিয়ার ওপর। ইউরোপে বন্যা হলে সেটি হয় ‘গ্লোবাল ট্র্যাজেডি’, কিন্তু বাংলাদেশের উপকূলে হাজার মানুষ গৃহহীন হলে সেটি অনেক সময় ‘লোকাল নিউজ’ হয়েও থাকে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ্য এই সমীকরণ কিছুটা বদলে দিয়েছে। এখন কক্সবাজারের একজন তরুণীও ভিডিও বানিয়ে বলতে পারেন সমুদ্র কীভাবে তার বাড়ি গ্রাস করছে। সুন্দরবনের জেলে নিজের ভাষায় জলবায়ুর গল্প বলতে পারেন। অর্থাৎ পরিবেশ আন্দোলন এখন শুধু রাষ্ট্র বা এনজিওর বিষয় নয়, এটি মানুষের ব্যক্তিগত গল্প বলার জায়গাও হয়ে উঠছে।

ভারতীয় সিনেমাতেও পরিবেশ এখন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। অমিতাভ বচ্চনের ‘আরক্ষণ’ বা দক্ষিণ ভারতের অনেক সিনেমায় উন্নয়ন বনাম প্রকৃতির দ্বন্দ্ব দেখা যায়। সাম্প্রতিক মালায়ালাম সিনেমাগুলোতে পাহাড় কাটা, নদী দখল বা করপোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশি সিনেমা এখনো খুব শক্তিশালীভাবে জলবায়ু সংকটকে ধারণ করতে পারেনি, কিন্তু ডকুমেন্টারি ও স্বাধীন চলচ্চিত্রে এই চেষ্টাগুলো বাড়ছে।

মজার ব্যাপার হলো, পরিবেশ নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী কাজগুলো প্রায়ই ‘মেইনস্ট্রিম’ নয়। কারণ প্রকৃত পরিবেশ রাজনীতি খুব আরামদায়ক কিছু নয়। এটি প্রশ্ন তোলে—কেন কিছু দেশ পৃথিবী ধ্বংস করার অধিকার পাবে? কেন উন্নয়নের নামে নদী মেরে ফেলা হবে? কেন বিজ্ঞাপন আমাদের এমন জীবনযাপনে উৎসাহিত করবে, যা পৃথিবী টিকিয়ে রাখতে পারে না?

আসলে পরিবেশ সংকটের বড় অংশই একটি ‘কমিউনিকেশন ক্রাইসিস’। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মানুষ প্রকৃতির চেয়ে স্ক্রিন বেশি দেখে। ফলে নদী শুকিয়ে যাওয়ার চেয়ে নতুন ফোনের বিজ্ঞাপন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পুঁজিবাদ এখানে শুধু অর্থনীতি নয়, এটি কল্পনারও নিয়ন্ত্রক। এই কারণেই বিশ্ব পরিবেশ দিবস এখন শুধু গাছ লাগানোর অনুষ্ঠান হতে পারে না। এটি হওয়া উচিত নতুন গল্প বলার দিন। এমন গল্প, যেখানে পৃথিবী শুধু একটি ‘লোকেশন’ নয়, বরং একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ও মানবিক সত্তা।

হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ আন্দোলনটি হবে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন—যেখানে সিনেমা, সাহিত্য, গান, সাংবাদিকতা, ইউটিউব ভিডিও, এমনকি মিমও মানুষকে নতুনভাবে পৃথিবীর কথা ভাবতে শেখাবে।

পরিবেশ সংকট নিয়ে সিনেমা বহুদিন ধরেই আমাদের কল্পনা, ভয় এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে। বং জুন-হো’র ‘স্নোপিয়ার্সার’–এ দেখা যায় জলবায়ু বিপর্যয়ের পর বেঁচে থাকা মানুষদের শ্রেণিভিত্তিক বিভক্ত এক ট্রেন-সভ্যতা, যেখানে পরিবেশ সংকট শেষ পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্যের গল্প হয়ে ওঠে।

আবার ওকজা’র সিনেমায় করপোরেট খাদ্যশিল্প, প্রাণী ও পুঁজিবাদের সম্পর্ককে এমনভাবে দেখানো হয়, যা পরিবেশ রাজনীতিকে একেবারে ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গায় নিয়ে আসে। পিক্সারের ‘ওয়াল-ই’ হয়তো শিশুদের অ্যানিমেশন, কিন্তু সেটি মূলত অতিভোগবাদ, প্লাস্টিক সভ্যতা এবং করপোরেট পৃথিবীর বিরুদ্ধে এক গভীর রাজনৈতিক ভাষ্য।

ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’-এ ধ্বংসপ্রায় পৃথিবী ছেড়ে মানুষ নতুন গ্রহ খুঁজতে বের হয়। যেন পৃথিবীকে বাঁচানোর চেয়ে পালিয়ে যাওয়ার কল্পনাই আধুনিক সভ্যতার বড় স্বপ্ন। আর ‘ডোন্ট লুক আপ’ সিনেমাটি দেখিয়েছে, কীভাবে মিডিয়া, করপোরেট শক্তি ও রাজনৈতিক পপুলিজম মিলে বৈজ্ঞানিক সত্যকেও ‘বিনোদন’ বানিয়ে ফেলে।

এই সিনেমাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবেশ সংকট শুধু প্রকৃতির সংকট নয়। এটি মিডিয়া, পুঁজিবাদ, তথ্য রাজনীতি এবং মানুষের কল্পনাশক্তিরও সংকট।

এই লেখাটি শেষ করব সত্যজিৎ রায়ের ‘গণশত্রু’ সিনেমাটির প্রসঙ্গ দিয়ে। সেখানে ডা. অশোক গুপ্ত আবিষ্কার করেন যে শহরের মন্দিরের ‘পবিত্র’ জল আসলে দূষিত এবং মানুষের অসুস্থতার কারণ। কিন্তু সত্য প্রকাশ করতে গেলে তিনি শুধু ধর্মীয় গোঁড়ামির মুখোমুখিই হন না; রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জনমোহিনী প্রচারণাও তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই লড়াইয়ে একজন সাংবাদিক ও কিছু তরুণ তার পাশে এসে দাঁড়ায়।

সত্যজিৎ যেন দেখাতে চেয়েছিলেন—সমাজকে রক্ষা করতে বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা ও সাংবাদিকতার জোট কতটা জরুরি। আজকের জলবায়ু সংকটের সময়েও সেই কথাই নতুনভাবে সত্য হয়ে ওঠে। কারণ পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, এটি সত্য, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, সাবেক পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক। ইমেইল: [email protected] 

Related Articles

Latest Articles